নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারে
চাহিদার তুলনায় সার না পাওয়ার অভিযোগে আবারও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারে বিসিআইসির সার ডিলার মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্সের সামনে এ অবরোধ চলে। এ সময় বল্লভেরখাস ইউনিয়ন ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে অবরুদ্ধ করে কৃষকেরা ডিলার ও সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সার সরবরাহের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর কৃষকেরা অবরোধ তুলে নিলে পুলিশ অবরুদ্ধ কৃষি কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে কচাকাটা থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্র ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে গাবতলা বাজারের ওই ডিলার পয়েন্টে সার বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন এলাকার কয়েক শ কৃষক সেখানে জড়ো হন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তাঁরা সার নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। একপর্যায়ে বরাদ্দকৃত সার শেষ হয়ে গেছে জানিয়ে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। অনেক কৃষক একাধিকবার ডিলারের কাছে গিয়েও সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে আমন ধান, সবজি, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
ক্ষুব্ধ কৃষকেরা ডিলার ও কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কচাকাটা থানার পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। তবে কৃষকেরা সারের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত অবরোধ তুলে নিতে অনড় ছিলেন।
এ নিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে নাগেশ্বরীতে সারের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা একাধিকবার ঘটল। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী ও রামখানা ইউনিয়নে একই দাবিতে কৃষকেরা বিক্ষোভ করেন। ওই সময়ও বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বামনডাঙ্গায় প্রশাসনের উপস্থিতিতে মজুত থাকা ১৪০ বস্তা ইউরিয়া ও ১০০ বস্তা ডিএপি কৃষকদের মধ্যে বিতরণের তথ্যও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, রামখানা ও বেরুবাড়ীতে নতুন করে সার এলে তা কৃষকদের মধ্যে বিতরণের কথা ছিল। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতে সার সংকট হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু কৃষক আগাম সার কিনে রাখায় চাহিদা বেড়েছে।
অন্যদিকে, নাগেশ্বরীর বিভিন্ন এলাকায় সার সরবরাহ নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি রাতের বেলায় সার পাচারের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে গভীর রাতে নৌকায় পাচারের সময় ১ হাজার ৯৫০ কেজি সার আটকের কথা বলা হয়েছে; পরে তা স্থানীয় কৃষকদের তালিকা করে সরকারি দামে বিক্রির তথ্যও দেওয়া হয়।
কৃষক ওমর ফারুক বলেন, “এক সপ্তাহ আগেও কচাকাটায় সারের জন্য আন্দোলন হয়েছে। তখন সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। দিন যত যাচ্ছে, কৃষকের দুর্ভোগ তত বাড়ছে।”
সার ব্যবস্থাপনায় সরকারি পর্যায়ে মাসভিত্তিক বরাদ্দ ও মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশ হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালাও রয়েছে।
ফলে নাগেশ্বরীর কৃষকদের বর্তমান ক্ষোভের মূল প্রশ্ন এখন শুধু সার বরাদ্দ আছে কি না—তা নয়; বরাদ্দকৃত সার কোন ডিলারের মাধ্যমে, কখন, কী পরিমাণে এবং কার কাছে বিক্রি হচ্ছে—সেই তথ্যও স্বচ্ছভাবে প্রকাশের দাবি উঠছে। ধারাবাহিক বিক্ষোভের কারণে স্থানীয় প্রশাসনের জন্য ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ, মজুত ও বিক্রির হিসাব প্রকাশ এবং কৃষক পর্যায়ে সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিজ্ঞ মহল মনে করে সার কৃষকের উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। তাই সংকটের প্রকৃত কারণ সরবরাহ ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা নাকি বিতরণ ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি—তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করে দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কৃষকের সারের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply