হোম / কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম

উপকূলের ‘মহৌষধ’ ও অর্থকরী সম্ভাবনা কেওড়া ফল

প্রকাশ: 9 August 2026, 06:25 PM পড়া হয়েছে: বার

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদে পুষ্টি, ঔষধিগুণ ও অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

নিউজ ডেস্কঃ
বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের খাল ও নদীর পাড়ে তাকালেই চোখে পড়ে থোকা থোকা সবুজ ফল। দেখতে অনেকটা গোল ডুমুরের মতো। উপকূলীয় মানুষের অতি পরিচিত এই ফলটির নাম কেওড়া। বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala। সুন্দরবনের হরিণ ও বানরের অন্যতম প্রধান খাদ্য কেওড়া শুধু বন্যপ্রাণীর খাবারই নয়; স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায়ও এর রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যবহার। পুষ্টিগুণ, সম্ভাব্য ঔষধিগুণ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে ফলটি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

বনজীবীদের জীবনে কেওড়া

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বনজীবীদের কাছে কেওড়া পরিচিত একটি মৌসুমি ফল। আড়পাংশিয়া এলাকার বনজীবী গোলাম মোস্তফা জানান, ফাল্গুন মাসে কেওড়া গাছে ফুল আসে। আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত সাধারণত পাকা কেওড়া সংগ্রহ করা হয়।

তিনি বলেন, এ সময় সুন্দরবনে হরিণ ও বানরের কেওড়া খাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। স্থানীয়রাও কাঁচা কেওড়া দিয়ে ছোট চিংড়ি মাছ রান্না করেন। এ ছাড়া মসুর ডালে টক হিসেবে ব্যবহার, চাটনি ও আচার তৈরিতেও কেওড়া ব্যবহৃত হয়।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, গরমের সময় কেওড়ার টক শরীরকে সতেজ করে এবং হজমের সমস্যায় উপকারী বলে মনে করা হয়। তবে এসব প্রচলিত স্বাস্থ্যধারণার বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ কেওড়া

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেন কেওড়া ফল নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, পুষ্টিগুণের দিক থেকে কেওড়া একটি সম্ভাবনাময় দেশীয় ফল।

ড. জুলফিকার হোসেন বলেন, তাঁদের গবেষণায় কেওড়া ফলে প্রায় ১২ শতাংশ শর্করা, ৪ শতাংশ আমিষ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন সি পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দেশীয় ফলের মধ্যে আমলকীর পর কেওড়া ফলে তুলনামূলকভাবে উচ্চমাত্রায় পলিফেনল রয়েছে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, কেওড়া ফলে আয়রন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্কসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের পুষ্টি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, কেওড়া ফলের মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য জৈব সক্রিয় উপাদান থাকায় ডায়াবেটিস, ডায়রিয়া, প্রদাহ ও ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকারী ভূমিকা থাকতে পারে। তবে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় কেওড়াকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের আগে আরও ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

সুন্দরবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ গাছ

কেওড়ার গুরুত্ব শুধু ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের পরিবেশ ও উপকূলীয় প্রতিবেশ রক্ষায় কেওড়া গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কেওড়া সুন্দরবনের একটি ‘অগ্রগামী বৃক্ষ’ বা Pioneer Plant। নতুন জেগে ওঠা চর ও উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এই গাছ দ্রুত জন্মাতে পারে। এর শিকড় ও গাছপালা মাটিকে ধরে রাখায় ভূমিক্ষয় কমাতে সহায়তা করে।

জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারের প্রবল স্রোতের সময় উপকূলীয় বনভূমি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। ফলে কেওড়াসহ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ উপকূলীয় জনপদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অর্থকরী সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

কেওড়া ফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কেওড়া সীমিত পরিসরে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এর বহুমুখী ব্যবহার সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেওড়া দিয়ে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চাটনি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করা যেতে পারে। মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও কেওড়াজাত পণ্যের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বনজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে মৌসুমি এই ফলকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

পরিকল্পিত উদ্যোগের অপেক্ষায় কেওড়া

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কেওড়াকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য ও বন্যপ্রাণীর খাদ্যচাহিদার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণা, সংরক্ষণ, টেকসই সংগ্রহ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সুন্দরবনের এই দেশীয় ফল হয়ে উঠতে পারে উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন সম্পদ। প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে কেওড়া শুধু সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর প্রিয় খাদ্য নয়, উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!