হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

৫৫ বছর পরও দেশের মাটিতে ফেরেনি শহিদ বুদ্ধিজীবি বীরমুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে অযত্নে সমাধি,রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবী স্বজনদের।

প্রকাশ: 7 August 2026, 02:34 PM পড়া হয়েছে: ২০ বার

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম), প্রতিনিধি

আজ ৭ আগস্ট। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার জয়মনিরহাট ইউনিয়নের কৃতি সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই শিক্ষকের স্মৃতিতে স্থানীয়ভাবে নানা কর্মসূচি পালিত হলেও তাঁর শেষ ঠিকানা আজও দেশের বাইরে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার একটি সীমান্তবর্তী এলাকায় অযত্নে পড়ে আছে তাঁর সমাধি। দীর্ঘদিন ধরে সেটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি শিক্ষকতার দায়িত্বের পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বামনহাটে গড়ে ওঠা যুব শিবিরে ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন ছিল তাঁর দায়িত্বের অংশ।

১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিংঝাড় এলাকায় তৎকালীন বগনী রেলসেতুর কাছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থানকালে রাজাকারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। ব্রাশফায়ারে গুরুতর আহত হন অধ্যাপক ওয়াহাব তালুকদার। পরে পাকিস্তানি সেনারা সীমান্ত অতিক্রম করে তাঁকে আটক করে। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়ার পর তাঁকে বেয়নেট দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

সেই সময় সীমান্ত এলাকায় তীব্র গোলাবর্ষণ ও মর্টার হামলার কারণে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে এনে দাফন করা সম্ভব হয়নি। পরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বামনহাট সীমান্তসংলগ্ন ফুলকুমার নদের তীরের কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই সমাধিই রয়ে গেছে ভারতের মাটিতে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীভাঙন ও সংরক্ষণের অভাবে সমাধিটি এখন ঝুঁকির মুখে। দ্রুত সংরক্ষণ বা স্থানান্তরের উদ্যোগ না নিলে এটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে সমাধি বাংলাদেশে স্থানান্তরের আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।

শহিদ অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের পুত্র মিজান তালুকদার বলেন, “আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। অথচ তাঁর কবর আজও বিদেশের মাটিতে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে জন্মভূমিতে ফিরিয়ে এনে পুনঃসমাহিত করা হলে সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।”জয়মনিরহাট ইউনিয়নের আরেক কৃতি সন্তান ও চীন প্রবাসী ডঃ রোকনুজ্জামান কিরন জানান,বীরমুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার বাঙালি জাতির গর্ব তিনি স্বাধীনতার জন্য শহিদ হয়েছেন। প্রতিবছর শহিদ বুদ্ধিজীবি দিবসে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয় অথচ তার সমাধি ভারতের মাটিতে অযত্ন অবহেলায় সংরক্ষণের অভাবে নদীগর্ভে বিলিনের পথে থাকা সত্বেও স্বজনরা সংরক্ষণ করতে ও সমাধিস্থলে যেতে পারে না এটা অত্যন্ত বেদনা দায়ক।

জয়মনিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ সরকার বলেন, “এটি শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়, পুরো এলাকার মানুষের প্রত্যাশা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বুদ্ধিজীবীর সমাধি বিদেশের মাটিতে অবহেলায় পড়ে থাকা দুঃখজনক। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাঁর সমাধি বাংলাদেশে এনে সংরক্ষণ এবং একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে তাঁর স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। তাঁদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁর সমাধি দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

আজ তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে ভূরুঙ্গামারীর মানুষের প্রত্যাশা—যে মানুষটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, অন্তত মৃত্যুর এত বছর পর তাঁর শেষ ঠিকানাটি যেন ফিরে আসে নিজের মাতৃভূমিতে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!