রাজশাহীর তানোরে গভীর নলকূপের অরক্ষিত গর্তে পড়ে শিশু সাজিদের মৃত্যু আবারও সামনে এনে দিল এক কঠিন সত্য—বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা এবং তদারকির অভাব শুধু দুর্ভোগই নয়, সরাসরি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সাজিদের মর্মান্তিক মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সরকারের ক্রমাগত ব্যর্থতার ধারাবাহিক চিত্র, যেখানে নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি শব্দগুলো কেবল ফাইলে-ফোকরে সীমাবদ্ধ।
আমরা ভুলে যাইনি ঢাকার শাহজাহানপুরে জিহান নামের শিশুটির করুণ মৃত্যুর কথা। ওয়াসার অরক্ষিত গর্তে পড়ে ৩০০ ফুট নিচে আটকে পড়া জিহানকে উদ্ধার করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের অদক্ষতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও যান্ত্রিক দুর্বলতা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ পায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর তারা যখন ‘কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই’ বলে সিলগালা করতে উদ্যত হয়, তখন আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক ছাত্রের নির্মিত ‘হ্যাসিং পদ্ধতি’ শিশুটির দেহ উদ্ধার করে জাতিকে বিস্মিত করে।
এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে—ফায়ার সার্ভিসের জনবল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় যে ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে, তা আজও কাটেনি। অথচ এই সংস্থাটির দায়িত্ব দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন–মৃত্যুর মুহূর্তে প্রথম সারিতে দাঁড়ানো।
তানোরে শিশু সাজিদের ক্ষেত্রেও সেই একই চিত্র—গর্তে পড়ার পর সকাল ১১টার মধ্যেই যদি খনন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো একটি শিশুর প্রাণ ফিরে পাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়, সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘ কালক্ষেপণে খনন শুরু হয় বিকেল ৪টার পরে। একটি শিশুর দেহ ৩২ ঘণ্টা অন্ধকার, শীত ও অক্সিজেনশূন্য সরু নলের ভিতর পড়ে ছিল—এ দৃশ্য কেবল হৃদয়বিদারকই নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতার করুণ প্রতিচ্ছবি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। সমস্যা তাঁদের নিষ্ঠায় নয়—সমস্যা নেতৃত্বে, প্রশাসনে এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি এই খাতকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে ফায়ার সার্ভিস কতই না চেষ্টা করুক, প্রাণহানির ঝুঁকি থেকেই যাবে।
এই মুহূর্তে সরকারের দায়িত্ব স্পষ্ট—
১. যারা অরক্ষিত গভীর গর্ত রেখে মানুষ হত্যার ফাঁদ তৈরি করেছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
২. শিশু সাজিদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৩. ফায়ার সার্ভিসকে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক রেসকিউ প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. দেশব্যাপী সব ধরনের অরক্ষিত গর্ত, নির্মাণকাজ ও বিপজ্জনক স্থাপনার তালিকা তৈরি করে তা দ্রুত নিরাপদ করার জন্য বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।
এটি কোনো ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’ নয়—এটি কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে সৃষ্ট একটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু।
রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতা কেবল একটি শিশুর মৃত্যু দিয়ে শেষ হয় না—তা আমাদের বিবেক, আমাদের নিরাপত্তা ও আমাদের মানবিকতার মৃত্যুঘণ্টা বাজায়।
প্রশ্ন একটাই—অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার এই অন্ধগহ্বরে আর কত সাজিদের প্রাণ ঝরলে সরকার জেগে উঠবে?

Leave a Reply