হোম / আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে শৈশব, তীরে পড়ে রইল স্বপ্ন

প্রকাশ: 22 October 2026, 09:46 PM পড়া হয়েছে: ২ বার

শফিকুল ইসলাম বেবু …

​মরিয়ম ছোট মানুষ, তাই জীবনের বড় বড় হিসেবনিকেশ সে বোঝে না। তবে কাঠের ওপর হাতুড়ির ‘ঠক ঠক’ শব্দটা সে চেনে। চরের মানুষের কাছে এই ঠক ঠক শব্দটার মানে একটাই—কারো ঘর ভাঙছে, কারো ভিটে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে, এখন নতুন ঠিকানার খোঁজে উচ্ছেদ হওয়ার পালা।

​কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বরের সকালটা অন্যরকম ছিল।

​প্রথম শ্রেণীর জাহিদ আর আয়শা নতুন ব্যাগে বইখাতা গুছিয়ে রওনা দিয়েছিল। ব্যাগগুলো বেশিদিনের পুরোনো নয়, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের-৮৮ ব্যাচের কিছু দয়ালু মানুষ এসে চরের সব বাচ্চার হাতে এই সুন্দর ব্যাগ আর খাতা-কলমসহ অন্যান্য উপকরণ তুলে দিয়ে গেছেন। আয়শার মা সকালে ওর চুলটা যত্ন করে আঁচড়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ভালা করি পড়িস মা, বড় মানুশ হওয়া লাগবি।”

​কিন্তু খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি আসতেই আয়শাদের কচি পা দুটো থমকে গেল।

​ঠক ঠক শব্দটা তাদের চেনা কোনো প্রতিবেশীর ভিটে থেকে আসছে না। শব্দটা আসছে তাদের স্বপ্নের বিদ্যালয় ভবনটি থেকে!

​স্কুলের টিন খোলা হচ্ছে, কাঠের খুঁটি আর লোহার এঙ্গেল সরাতে ব্যস্ত এলাকার মানুষজন। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সাইফুর রহমান বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন। ১৯৭৮ সালে তৈরি হওয়া এই স্কুলটি এর আগে পাঁচ-পাঁচবার নদী ভাঙনের মুখে পড়ে স্থান বদলেছে। এই নিয়ে ছয়বার! কিন্তু এবার ব্রক্ষ্মপুত্র যেন একদম জেদ ধরে বসেছে, স্কুলটির এক বিঘাও আর বাকি রাখবে না।

​দ্বিতীয় শ্রেণীর আরাফাত মরিয়মের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মরিয়ম, আমাগো পড়ালেখা কি শেষ?”

​মরিয়মের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সত্যিই তো, এই দ্বীপাঞ্চলে আর তো কোনো পড়ার জায়গা নেই!

​কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল পঞ্চম শ্রেণীর শিমলা আর মাজেদুল। শিমলার মাথার ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। চরাঞ্চলে কোনো মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ হওয়া মানেই হলো অল্প বয়সে পিঁড়িতে বসা। শিমলা জানে, স্কুলটা না থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে তার কপালেও কনের সাজ জুটে যাবে। তার শৈশব, তার স্বপ্ন—সব ওই চরের বালুতে ঢাকা পড়ে যাবে।

​চতুর্থ শ্রেণীর সানজিদা ধূলিমাখা পায়ে হেঁটে এসে শিমলার পাশে দাঁড়াল। মন খারাপ করে বলল, “জানিস শিমলা, আমাদের সহপাঠী আকলিমাদের ভিটেও কাল রাতে নদীতে চলে গেছে। ওরা কোথায় গেছে কেউ জানে না। এভাবে শৈশবের বন্ধুরা সব হারিয়ে যাচ্ছে…”

​একশোটা শিশুর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে মেম্বার সাইফুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চরের এক সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের ভাগ্য যেন এই প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ের সঙ্গেই দোলে। ১৬টি নদ-নদী ঘেরা সাড়ে চার শতাধিক চরের প্রতিটি গল্পই এমন বেদনার।

​ঠিক তখনই চরের চেনা মুখ, ‘চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু সাহেব এসে দাঁড়ালেন সেখানে। চরের মানুষের ভালোবাসার এই মানুষটি প্রায়ই জেলা শহরে মিছিল-সমাবেশ করেন, চরের মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেন। তিনি চরের মানুষের কাঁধে হাত রেখে দৃঢ় গলায় বললেন, “এদের স্বপ্ন ভাঙতে দেওয়া যাবে না। চরের মানুষ তো ভিনগ্রহের আদম সন্তান নয়, ওরাও এ দেশের মানুষ।”

​বেবু সাহেবের চোখে তখন এক নতুন স্বপ্নের আগুন। তিনি চান চরের জন্য পৃথক একটি ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’। যতদিন নদী ভাঙন বন্ধ না হয়, ততদিন চরে চরে যেন চালু করা হয় ‘ভাসমান নদী-স্কুল’—যা নদী ভাঙলেও ভেসে থাকবে, পড়ালেখা থামবে না। তিনি চান মুমূর্ষু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘নৌ-অ্যাম্বুলেন্স’, আর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ।

​স্কুলের শেষ কাঠের টুকরোটি যখন খুলে ফেলা হলো, তখন জাহিদ, আয়শা, শিমলারা তাদের নতুন উপহার পাওয়া স্কুল ব্যাগগুলো বুকে চেপে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। নদী উপচে জল আসছে, যেন একশো শিশুর অদেখা চোখের জল ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে মিশে এক হয়ে যাচ্ছে।

​তবে ব্রহ্মপুত্র যত বড়ই হোক, চরের মানুষের স্বপ্নের চেয়ে নিশ্চয়ই বড় নয়! মেঘের আড়ালে রোদ যেমন হাসে, তেমনই হয়তো কোনো একদিন এই নদীজুড়ে ভেসে বেড়াবে স্বপ্নের এক ভাসমান পাঠশালা—যেখানে আয়শা, জাহিদ আর শিমলা আবার হাসিমুখে নতুন খাতা খুলে লিখতে বসবে তাদের ভবিষ্যতের গল্প।

লেখক -শিক্ষাবিদ,সাংবাদিক,রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!