নরসিংদী প্রতিনিধিঃ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া পাঁচ হাজারের বেশি গুলি ও ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যেই জেলাজুড়ে একের পর এক খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সহিংসতা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন নরসিংদীর সাধারণ মানুষ। লুট হওয়া অস্ত্রসহ জেলার সব অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় কারাগারে থাকা ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যান। হামলার সময় কারাগার থেকে লুট করা হয় ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও আট হাজারের বেশি গুলি। পরবর্তীতে দফায় দফায় আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ কয়েদিকে পুনরায় কারাগারে ফেরানো হলেও এখনো উদ্ধার হয়নি পাঁচ হাজারের বেশি কার্তুজ। লুট হওয়া ৮৫টি অস্ত্রের মধ্যে দেড় বছরে ৫৮টি উদ্ধার হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২৭টি আগ্নেয়াস্ত্র। এসবের মধ্যে চায়না রাইফেল, বিডি রাইফেল ও বোর শটগান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে গত এক বছরে নরসিংদী জেলায় শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলগুলোতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, আগে যেখানে টেঁটা বা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সংঘর্ষ হতো, এখন সেখানে নিয়মিত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ নিরাপত্তার কথা বলে ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও পরে আবার নির্বাচনী মাঠে ফেরেন। গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী প্রকাশ্যে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন এবং বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরার বিষয়টি ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছেন।
নরসিংদীর স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, স্থানীয় ও জাতীয় প্রায় সব নির্বাচনেই চরাঞ্চল অশান্ত হয়ে ওঠে এবং অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যায়। কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি এখনও পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
নরসিংদী জেলা জজ আদালতের এক আইনজীবী বলেন, “আগের নির্বাচনগুলোর সময় যেসব অবৈধ অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, তার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র। এসব অস্ত্রকে ঘিরে জেলার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। প্রশাসন যদি দ্রুত এগুলো উদ্ধার করতে না পারে, তবে নাশকতার ঝুঁকি থেকেই যাবে।”
চরাঞ্চলের বাসিন্দা ও জেলা বিএনপির সহছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শরীফ আহমেদ বলেন, “চরাঞ্চলে এখন দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। সমাজ ও আসন্ন নির্বাচনের জন্য এটি বড় হুমকি। লুট হওয়া অস্ত্রসহ সব অবৈধ অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার করা জরুরি।”
নরসিংদী জেলা বিএনপির সহসভাপতি হারুন অর রশিদ হারুন বলেন, “জেলাজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের আতঙ্ক আগেই ছিল। তার ওপর কারাগার থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।”
এ বিষয়ে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. কলিমুল্লাহ বলেন, জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং কিছু গোলাবারুদও উদ্ধার হয়েছে। বাকি ২৭টি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। সম্প্রতি নরসিংদী সফরকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশ অনুযায়ী যৌথবাহিনীর মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও কার্যকরভাবে লুট হওয়া অস্ত্র এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
অপরাধ
নরসিংদী কারাগার থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার গুলি ও ২৭ অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি, নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে শঙ্কা
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪৮ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৩৩৭ বার
বিষয়
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply