কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
বহুল আলোচিত কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলেও আজও ন্যায়বিচার পায়নি তার পরিবার। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয় ফেলানী। দীর্ঘ দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও ভারতের আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় বিচারহীনতার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন তার বাবা-মা ও স্বজনরা।
ফেলানী হত্যার বিচার চেয়ে বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় ন্যায়বিচার আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। আজও তারা সঠিক বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন।
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, “আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাইনি। ১৫ বছর ধরে আইনের আশায় ঘুরছি। এখনো সীমান্তে মানুষ পাখির মতো মারা যাচ্ছে। ফেলানীর বিচার হলে হয়তো আর কোনো বিএসএফ সদস্য গুলি করার সাহস পেত না। জীবিত অবস্থায় মেয়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।”
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু আজও কোনো বিচার হয়নি। ১৫ বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করছি।” তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনায় লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামের সহযোগিতায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে তার ছোট ছেলে আরফান হোসেন বিজিবিতে চাকরির সুযোগ পেয়েছে। এতে পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে বলেও জানান তিনি।
ফেলানীর ভাই আরফান হোসেন বলেন, “দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আমার বোনের হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছি। আজও ন্যায়বিচার পাইনি। আমি চাকরি পেয়েছি—এতে হয়তো কবরে শুয়েও আমার বোন একটু শান্তি পাবে।” এ কথা বলতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ওঠেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি শুক্রবার ভোরে অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে অবস্থানরত পরিবার থেকে দেশে ফেরার সময় বিএসএফের গুলিতে আহত হয় ফেলানী। প্রায় আধাঘণ্টা যন্ত্রণায় ছটফট করার পর তার মৃত্যু হয়। পরে তার নিথর দেহ প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতাঁরের ওপর ঝুলে থাকতে দেখা যায়, যা দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে মামলার বিচার শুরু হয়। ওই মামলায় ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ও মামা হানিফ সাক্ষ্য দেন। তবে ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের আবেদন জানানো হলে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২ জুলাই দ্বিতীয়বারও অমিয় ঘোষ খালাস পান।
পরবর্তী সময়ে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারণ হলেও মামলার কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। সর্বশেষ ফেলানীর বাবা ভারতের উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন, যা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
ফেলানী খাতুন ছিলেন নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী পরিবারসহ ভারতে বসবাস করছিল। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথেই সীমান্তে প্রাণ হারায় এই কিশোরী। দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও তার পরিবার আশায় বুক বেঁধে রয়েছে—একদিন হয়তো ন্যায়বিচার মিলবে।
অপরাধ
বিচার থেকে বঞ্চিত পরিবারঃ কুড়িগ্রামে সীমান্তে ফেলানী হত্যার ১৫ বছর
প্রকাশ: ৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ১৬৪ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply