হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

স্লিপের সার নয়, কৃষকের অধিকার নিশ্চিত হোক খোলা বাজারে

প্রকাশ: 7 September 2026, 10:25 PM পড়া হয়েছে: ২৯ বার

আজিজুল হক:

ধানের শীষে কৃষকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের শুরু বীজ থেকে, বেড়ে ওঠে সার-পানিতে, আর ফসল ঘরে তুলতে প্রয়োজন জ্বালানি। অথচ মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম হয়ে দাঁড়ায়—সার কোথায়, বীজ কোথায়, ডিজেল কোথায়?

কখনো ডিলারের দোকানে দীর্ঘ লাইন, কখনো স্লিপের জন্য অপেক্ষা, আবার কখনো ‘স্টক নেই’ বলে কৃষককে ফিরিয়ে দেওয়া—এসব চিত্র নতুন নয়। কৃষকের প্রয়োজনীয় উপকরণ যদি সহজে ও ন্যায্য দামে না মেলে, তাহলে কৃষি উৎপাদনের পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বিশেষ করে সার বিতরণে স্লিপনির্ভর ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। একজন কৃষক তাঁর জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সার কিনতে পারবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সার কিনতে যদি তাঁকে আগে স্লিপ সংগ্রহ করতে হয়, নির্দিষ্ট দোকানের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কিংবা বিতরণব্যবস্থার অনিয়মের কারণে ফিরে আসতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কৃষকের জন্য ব্যবস্থা, নাকি ব্যবস্থার জন্য কৃষক?

স্লিপভিত্তিক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হতে পারে সুশৃঙ্খল বিতরণ ও অপচয় রোধ। কিন্তু বাস্তবে কোথাও কোথাও এটি যদি কৃষকের ভোগান্তি বাড়ায়, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা জরুরি। কারণ কৃষকের জমিতে সার দেওয়ার সময় চলে যায়; প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য ফসলের সময় অপেক্ষা করে না।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরবরাহ নিশ্চিত করা। কৃষকের প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি, এমওপি, উন্নতমানের বীজ এবং সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল—এসব পণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে থাকতে হবে। কৃষক যেন নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বৈধ মূল্যে, সহজে এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থায় কিনতে পারেন।

কারণ বাজারে পণ্য থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দিলে সুযোগ নেয় একটি অসাধু চক্র। তখন শুরু হয় মজুতদারি, কালোবাজারি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।

আর কৃষকের ক্ষোভ কখনো শুধু বাজারের ক্ষোভ থাকে না। একটি ছোট সমস্যাও দ্রুত সামাজিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় সার বিতরণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, রাস্তা অবরোধ কিংবা ডিলারের গুদাম ঘিরে বিক্ষোভের মতো ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হয়। সরকারের নীতির দুর্বলতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম—যে কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী শক্তি জনমনে অসন্তোষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই বিষয়টি শুধু কৃষি বিভাগের নয়; এটি জনস্বার্থ, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে কৃষকের ন্যায্য দাবিকে ‘সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র’ বলে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। বরং উল্টোটা জরুরি। কৃষকের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে, অনিয়ম হলে তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কৃষকের ন্যায্য দাবি দমন করে নয়, দাবির যৌক্তিক সমাধান করেই ষড়যন্ত্রের সুযোগ বন্ধ করা যায়।

প্রয়োজন হলে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কোন ডিলার কত সার পেলেন, কত বিক্রি করলেন, কত মজুত আছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা সম্ভব। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের তথ্য প্রকাশ করা হলে কৃষকও জানতে পারবেন তাঁর এলাকায় কতটা সার এসেছে। এতে গুজব ও বিভ্রান্তি কমবে।

একই সঙ্গে ডিলারদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কাগজে-কলমে মজুত দেখিয়ে বাস্তবে সংকট তৈরি করা, নির্ধারিত মূল্যের বেশি নেওয়া কিংবা পছন্দের কৃষককে পণ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সার, বীজ ও জ্বালানি তেলকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের এমন কাঠামোয় নেওয়া যাবে না, যাতে প্রকৃত কৃষকই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন। নিয়ন্ত্রণ দরকার, কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য হতে হবে বাজারে স্বচ্ছতা ও কৃষকের সুরক্ষা; কৃষকের চলাচল ও ক্রয়ক্ষমতা সীমিত করা নয়।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। কৃষক উৎপাদন না করলে বাজারে খাদ্য থাকবে না। তাই কৃষকের হাতে সময়মতো উপকরণ পৌঁছে দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি রাষ্ট্রের কৃষিনীতি বাস্তবায়নের মৌলিক দায়িত্ব।

সার স্লিপে আটকে থাকবে না, সার থাকবে বাজারে।

বীজের জন্য কৃষককে ঘুরতে হবে না, বীজ থাকবে সহজলভ্য।

জ্বালানির জন্য লাইন নয়, নিশ্চিত সরবরাহ থাকবে।

সরকার চাইলে এখনই একটি কার্যকর বার্তা দিতে পারে—কৃষকের প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের কৃত্রিম সংকট কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। একই সঙ্গে কৃষককে স্লিপের জটিলতা থেকে মুক্ত করে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও বাজারভিত্তিক সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে।

কারণ কৃষকের স্বস্তিই কৃষির স্থিতি, আর কৃষির স্থিতিই খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি।

সেই ভিত্তিকে দুর্বল করার সুযোগ কাউকেই দেওয়া উচিত নয়।

লেখক:সাংবাদিক, প্রভাষক,সমসাময়িক প্রাবন্ধিক ও সমাজ সংস্কারক।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!