মনজুরুল ইসলাম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি হলো তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই ভূখণ্ড রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত পাহারার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্তের অধিকাংশ অংশ ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। দীর্ঘ এই সীমান্তে বছরের পর বছর ধরে সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, মাদক পাচার, মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, নারী ও শিশু পাচার, গবাদিপশু এবং পণ্যের অবৈধ বাণিজ্যসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথিত “পুশ-ইন” বা জোরপূর্বক লোকজন ঠেলে পাঠানোর অভিযোগও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে দেশের সীমান্ত রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। স্বাধীনতার পর থেকে বাহিনীটি সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সীমান্তের ব্যাপ্তি, অপরাধের ধরন এবং আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের তুলনায় অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শুধু বিজিবির ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতাকেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিজিবির ব্যাটালিয়ন পর্যায় থেকে ঊর্ধ্বতন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দুটি বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব, কমান্ড ও অপারেশনাল সমন্বয়ের একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ইতোমধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তে যৌথ টহল বা সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা তুলনামূলকভাবে কম বলে অনেকের অভিমত।
সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততার পক্ষে যারা মত দেন, তারা যুক্তি তুলে ধরেন যে সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার দক্ষতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত সীমান্ত, পাহাড়ি এলাকা এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করিডোরগুলোতে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর যৌথ উপস্থিতি অপরাধীদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এ কথাও সত্য যে, সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করলেই সব ধরনের সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত অপরাধ শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাই সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে “স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট” বা আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। এর আওতায় সীমান্তজুড়ে ড্রোন নজরদারি, থার্মাল ক্যামেরা, আধুনিক সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট এবং সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে অপরাধের সামাজিক ভিত্তিও দুর্বল করা সম্ভব।
আইনগতভাবে বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করতে পারে। তবে যদি সীমান্তে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর স্থায়ী যৌথ মোতায়েনকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করা হয়, তাহলে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা বা আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। এতে দায়িত্ব বণ্টন, কমান্ড কাঠামো, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা প্রশ্নে কূটনৈতিক মাত্রাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, সীমান্ত সম্মেলন, যৌথ সমন্বয় সভা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে হবে। কারণ শক্তিশালী সীমান্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল কূটনীতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও সীমান্ত সুরক্ষার প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি, সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় কৌশলগত সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শক্তিশালী জাতীয় ঐক্যের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ সীমান্ত ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও মানচিত্র রক্ষা কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার যে কোনো উদ্যোগকে তাই দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করা উচিত। একটি শক্তিশালী, আধুনিক ও কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনাই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাবান ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।
লেখক: সাংবাদিক, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক, মহাকাল গবেষক, মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply