মনজুরুল ইসলাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । ধারণা ছিল—এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি হবে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্র সমানভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে এবং বৈশ্বিক সংঘাত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত—যেমন সংকট, যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা সাম্প্রতিক যুদ্ধ—এইসব ইস্যুতে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব ও ভেটো ব্যবস্থার কারণে জাতিসংঘ অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—মুসলিম দেশগুলোর জন্য কি একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন? অনেক বিশ্লেষকের মতে, একটি সমন্বিত ‘মুসলিম জাতিসংঘ’ বা শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট গঠন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠছে।
বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা হলো (ওআইসি)। ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এই সংগঠন মূলত কূটনৈতিক আলোচনা ও নীতিগত অবস্থান প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বাস্তবে ওআইসির নিজস্ব কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো নেই, নেই বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষমতা। ফলে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সংস্থাটি প্রায়ই “গভীর উদ্বেগ” বা “নিন্দা প্রস্তাব”-এর বাইরে যেতে পারে না।
অথচ বাস্তবতা হলো—মুসলিম দেশগুলো বিশ্বের বিশাল জ্বালানি সম্পদের মালিক, এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও বাণিজ্য করিডোরের নিয়ন্ত্রণও অনেকাংশে তাদের হাতে। কিন্তু এই অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক শক্তিকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার মতো একটি কার্যকর কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি
একটি শক্তিশালী মুসলিম আন্তর্জাতিক সংস্থা বা “মুসলিম জাতিসংঘ” গড়ে উঠলে তা অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
প্রথমত, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
যদি মুসলিম দেশগুলোর একটি যৌথ নিরাপত্তা কাউন্সিল বা প্রতিরক্ষা কাঠামো থাকত, তাহলে আঞ্চলিক সংকট সমাধানে বাইরের শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন অনেক কমে যেত। এতে অনেক রাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস কিংবা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিও কমতে পারত।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
একটি সমন্বিত “ইসলামিক কমন মার্কেট” বা যৌথ অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতো। এমনকি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক মুদ্রা বা বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার কথাও ভাবা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মানবিক সংকট মোকাবিলা।
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয় প্রায়ই দেখা যায়। একটি শক্তিশালী যৌথ তহবিল, মানবিক সহায়তা কাঠামো এবং শরণার্থী পুনর্বাসন নীতিমালা থাকলে এসব সংকট মোকাবিলা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারত।
একটি সম্ভাব্য মুসলিম আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—রাষ্ট্র মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি জোরদারের চেষ্টা করবে। এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের কয়েকটি শক্তি এই নেতৃত্বকে বাস্তবসম্মত করে তোলে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। এই অভিজ্ঞতা একটি সম্ভাব্য মুসলিম শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনে কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা দিতে পারে।
মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার প্রায় ১০ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও মানবিক সংকটে সহমর্মিতা দেখানোর এই সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে সম্ভাবনা:
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণকারী বাংলাদেশ একটি “ব্রোকার স্টেট” বা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে একটি মুসলিম জাতিসংঘ গঠন মোটেও সহজ কাজ নয়। মুসলিম বিশ্বের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত চাপ—সবই এই উদ্যোগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তারপরও বিশ্ব এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ধীরে ধীরে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় যদি মুসলিম দেশগুলো নিজেদের সম্মিলিত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, তাহলে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জোট গঠনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি হয়তো আজই বাস্তবায়িত হবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের রাজনৈতিক স্থিতি ও ন্যায্য বৈশ্বিক ভারসাম্যের জন্য এমন একটি চিন্তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
নৈতিক কূটনীতি, মানবিক নেতৃত্ব এবং দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ চাইলে এই নতুন ধারণার অন্যতম অগ্রদূত হতে পারে। সময় হয়তো এখনো পুরোপুরি আসেনি, কিন্তু ইতিহাস বলে—যে জাতি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে, তারাই একদিন সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
*
লেখক-সাংবাদিক, মহাকাল গবেষক, সমাজ সংস্কারক ও প্রাবন্ধিক।

Leave a Reply