হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

বহু ভাষার জ্ঞান, শিক্ষকতা ও মানবসেবায় অনন্য মীর্জা এরফান আলী বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন মৌলভী শিক্ষককে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও অসংখ্য মানুষ

প্রকাশ: 29 September 2026, 02:33 PM পড়া হয়েছে: ১৬ বার
বহু ভাষার জ্ঞান, শিক্ষকতা ও মানবসেবায় অনন্য মীর্জা এরফান আলী বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন মৌলভী শিক্ষককে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও অসংখ্য মানুষ
বহু ভাষার জ্ঞান, শিক্ষকতা ও মানবসেবায় অনন্য মীর্জা এরফান আলী বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন মৌলভী শিক্ষককে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও অসংখ্য মানুষ

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:

একজন মানুষ একই সঙ্গে শিক্ষক, ইসলামিক চিন্তাবিদ, বহু ভাষাবিদ এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক—এমন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব গ্রামীণ জনপদে খুব বেশি দেখা যায় না। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মানুষের কাছে **মীর্জা এরফান আলী** তেমনই এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন মৌলভী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ইসলামিক চিন্তা, ভাষাচর্চা ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

ভারতের আসাম রাজ্যের **ধুবুড়ি জেলার গোলকগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে** তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই জ্ঞানচর্চা ও ভাষার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি ও অসমীয়াসহ বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। একটি সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর এই বহুভাষিক জ্ঞান তাঁকে অন্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।

মীর্জা এরফান আলীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর ভাষাজ্ঞান। **বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি ও অসমীয়াসহ একাধিক ভাষায় তাঁর পারদর্শিতা** স্থানীয়ভাবে তাঁকে একজন জ্ঞানপিপাসু ও বহুভাষী মানুষ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

বিশেষ করে আরবি, ফারসি ও উর্দুর মতো ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ইসলামি সাহিত্য ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁকে সমৃদ্ধ করেছিল। একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজির জ্ঞান তাঁকে আধুনিক শিক্ষা ও বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ করে দেয়।

একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর এই ভাষাগত দক্ষতা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জ্ঞান ও ভাষা শেখার আগ্রহ তৈরি করেছিল বলে তাঁর সাবেক ছাত্রদের স্মৃতিতে উঠে আসে।

বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে মৌলভী শিক্ষক হিসেবে মীর্জা এরফান আলীর দীর্ঘ কর্মজীবন তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্রেণিকক্ষে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব দিতেন বলে তাঁর সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মরণ করেন।

তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার বিষয় ছিল না; বরং একজন মানুষকে সৎ, দায়িত্বশীল ও জ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তোলাও ছিল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

আজ তাঁর অনেক ছাত্র দেশের গণ্ডি পেরিয়ে **বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে কর্মরত**। তাঁদের কেউ প্রশাসন, কেউ শিক্ষা, কেউ সামরিক, কেউ পেশাজীবনসহ নানা ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের জীবনের এই অগ্রযাত্রাকে একজন শিক্ষকের নীরব সাফল্য হিসেবেই দেখেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

শিক্ষকতার পাশাপাশি মীর্জা এরফান আলী ছিলেন একজন **ইসলামিক চিন্তাবিদ** হিসেবে পরিচিত। ধর্মীয় জ্ঞানকে তিনি মানুষের নৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতেন।

স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নেওয়ার প্রবণতা ছিল। তাঁর কাছে ধর্মীয় বিষয়ে জানতে যেমন মানুষ যেতেন, তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক নানা সমস্যায়ও অনেকে তাঁর মতামত নিতেন।

তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা। ফলে শিক্ষকতার বাইরে তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও তৈরি হয়েছিল।

মীর্জা এরফান আলীর আরেকটি পরিচয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার মাধ্যমে এলাকার অসংখ্য মানুষের সেবা করেছেন বলে স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।

একসময় গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসাসেবা আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না। সেই সময়ে পরিচিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধি নিয়ে পরামর্শ নিতেন। মীর্জা এরফান আলীর ক্ষেত্রেও মানুষের সেই আস্থার জায়গাটি তৈরি হয়েছিল।

শিক্ষক হিসেবে জ্ঞানদান এবং চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা—দুই ক্ষেত্রেই মানুষের কল্যাণকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে তাঁর পরিচিতজনেরা মনে করেন।

মীর্জা এরফান আলীর পারিবারিক জীবনও তাঁর কর্মময় জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর **দুই সন্তান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত, আর অপর এক সন্তান একটি ইসলামিক ক্যাডেট মাদ্রাসার পরিচালক** হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সন্তানদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের এই অবস্থান তাঁর পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিক্ষাদর্শের ধারাবাহিকতা হিসেবেও অনেকে দেখেন। একজন শিক্ষক যে মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারেন, তাঁর পরিবারের মধ্যেও তার একটি প্রতিফলন দেখা যায়।

একজন শিক্ষকের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু তাঁর চাকরির মেয়াদ কিংবা পদবি দিয়ে হয় না। তাঁর ছাত্ররা কোথায় পৌঁছেছেন, কীভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে ভূমিকা রাখছেন—সেটিও একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

মীর্জা এরফান আলীর ক্ষেত্রে তাঁর **অসংখ্য সাবেক ছাত্র বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরে কর্মরত**। তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

তাঁদের কাছে মীর্জা এরফান আলী শুধু একজন সাবেক শিক্ষক নন; বরং তাঁদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ।

ভারতের ধুবুড়ি জেলার গোলকগঞ্জে জন্ম এবং বাংলাদেশের ভূরুঙ্গামারীতে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা—মীর্জা এরফান আলীর জীবনকে সীমান্তবর্তী দুই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবেও দেখা যায়।

বাংলা, অসমীয়ার পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু, ফারসি ও আরবির মতো বিভিন্ন ভাষায় তাঁর দক্ষতা তাঁকে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে বাড়তি সক্ষমতা দিয়েছিল।

সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবনযাপন, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

সময় এগিয়ে যায়। একসময় যাঁরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেছেন, তাঁদের অনেকেই আজ অবসরজীবনে কিংবা স্মৃতির পাতায়। কিন্তু তাঁদের শিক্ষা ও আদর্শ তাঁদের ছাত্রদের জীবনে বেঁচে থাকে।

মীর্জা এরফান আলীর ক্ষেত্রেও তাঁর পরিচিত মানুষদের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে একজন **জ্ঞানী শিক্ষক, বহুভাষাবিদ, ইসলামিক চিন্তাবিদ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক** হিসেবে তাঁর কথা।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পদক বা সরকারি স্বীকৃতি নয়; বরং তাঁর ছাত্রদের সাফল্য, মানুষের ভালোবাসা এবং দীর্ঘদিন পরও তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার প্রবণতা।

একজন মানুষের জীবনের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদে নয়—তাঁর জ্ঞান, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও মানুষের জীবনে তৈরি করা প্রভাবের মধ্যেও নিহিত থাকে।

বলদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস, ভূরুঙ্গামারীর শিক্ষা-সংস্কৃতির ইতিহাস এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতিচর্চায় তাঁর মতো শিক্ষকদের জীবন সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁদের পূর্বসূরিদের সম্পর্কে জানতে পারবে। পুরোনো শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার, পুরোনো ছবি, নিয়োগ ও শিক্ষাজীবনের নথি এবং তাঁর চিকিৎসাসেবার স্মৃতি সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী তৈরি করা গেলে তা হতে পারে একটি মূল্যবান স্থানীয় ইতিহাসের দলিল।

মীর্জা এরফান আলী তাই কেবল একজন প্রাক্তন মৌলভী শিক্ষক নন—তিনি একটি প্রজন্মের শিক্ষক, একজন বহুভাষী জ্ঞানচর্চাকারী এবং মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!