একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই নির্বাচনকে ঘিরে রাষ্ট্র কতটা মানবিক, সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক আচরণ করে—সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
নির্বাচন সামনে এলেই সহিংসতা, ভয়ভীতি, অগ্নিসংযোগ ও দমন–পীড়নের চিত্র নতুন করে চোখে পড়ে। ঘরে আগুন, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা, মব সন্ত্রাস—এসব ঘটনা কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক হতে পারে না। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার পদদলিত হবে।
সবচেয়ে বেশি শঙ্কার বিষয় হলো—এই সহিংসতার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শিশু, নারী, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা নিরীহ পথচারী—কারোই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। রাজনীতির নামে যারা এই অমানবিকতা চালাচ্ছে, তারা শুধু প্রতিপক্ষকেই নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সংবাদমাধ্যমও আজ নিরাপদ নয়। পত্রিকা অফিসে হামলা, সাংবাদিকদের ভয় দেখানো কিংবা প্রকাশনা বন্ধ করার মতো ঘটনা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার শামিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো নির্বাচনই অর্থবহ হতে পারে না।
আরেকটি গভীর উদ্বেগের জায়গা হলো—মাদক ও অপরাধের রাজনীতিকরণ। তরুণ সমাজ যখন মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত, তখন রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধীদের বেড়ে ওঠা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত। রাজনীতি যদি নৈতিকতা হারায়, তবে সমাজও দিশেহারা হয়ে পড়ে।
তবে হতাশার মাঝেও আশার জায়গা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা উন্নয়ন চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা। রাজনীতি যদি সেই প্রত্যাশার ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না।
সময় এসেছে আগুনের রাজনীতি, প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ও মব সন্ত্রাস থেকে বেরিয়ে আসার। নির্বাচন হতে হবে মানুষের উৎসব, ভয় নয়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, আর মানুষের জীবন সবচেয়ে মূল্যবান।
গণতন্ত্রের পথ কখনো সহজ নয়, কিন্তু সেই পথেই হাঁটতে হয়। অন্যথায় ইতিহাস আমাদের শুধুই সতর্ক করবে—আর আমরা হয়তো আবারও দেরিতে বুঝব।
জাতীয়
নির্বাচন, সহিংসতা ও হারিয়ে যেতে বসা মানবিকতা – এম এ হক
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২২ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ২৬৫ বার
বিষয়
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply