(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়)
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্রমেই একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে—এটি কি প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্র হবে, নাকি কেবল একটি পূর্বনির্ধারিত আয়োজন? বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর হলেও অবধারিত।
দেশের রাজনীতি এখন কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত—সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ। সংলাপ নেই, সমঝোতা নেই, পারস্পরিক আস্থা নেই। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনকে ঘিরে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কোনো “অপপ্রচার” নয়—বরং ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার ফল। রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং ভোটকেন্দ্রকেন্দ্রিক চাপের স্মৃতি এখনও তাজা।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নির্বাচন কমিশনের। সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। জনগণের আস্থা যে আংশিক—তা কমিশন নিজেও জানে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হবে না।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখানে আর “নীরব দর্শক” থাকতে পারে না। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বারবার বিতর্কিত হয়েছে। যদি তারা পেশাদার ও দলনিরপেক্ষ না থাকে, তবে ভোটারদের কাছে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়বে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোটার উপস্থিতি কমবে—এটাই বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো তরুণ ও নতুন ভোটারদের অনাস্থা। যারা প্রথমবার ভোট দেওয়ার কথা ভাবছে, তারাই প্রশ্ন তুলছে—ভোট দিয়ে আদৌ কিছু বদলায় কি? এই প্রশ্ন কোনো ষড়যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। একটি প্রজন্ম যদি শুরুতেই ভোটবিমুখ হয়, তবে ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র হবে শূন্য খোলস।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও দ্বিচারিতা স্পষ্ট। একদিকে বলা হচ্ছে নির্বাচন হবে অবাধ ও সুষ্ঠু, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে অপ্রয়োজনীয় বা অস্বস্তিকর হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি নির্বাচন সত্যিই গ্রহণযোগ্য হয়, তবে স্বচ্ছতায় ভয় কোথায়?
ভোটাররা আজ আর অলীক প্রতিশ্রুতি চায় না। তারা চায় সততা, যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ত প্রতিনিধি। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশাসন—এসব মৌলিক ইস্যু উপেক্ষা করে নির্বাচন আয়োজন মানে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। একটি ভোট যে পরিবর্তনের শক্তি—এই বিশ্বাস ভেঙে পড়লে গণতন্ত্র কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতার বৈধতার প্রশ্ন। যদি এই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সহিংসতা-মুক্ত ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে সংকট আরও গভীর হবে। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন বাধাগ্রস্ত হলে গণতন্ত্র নয়—শুধু শাসন টিকে থাকবে।
সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—গণতন্ত্রকে সত্যিই শক্তিশালী করা হবে, নাকি আবারও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
আইন ও পরামর্শ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গণতন্ত্র কি সত্যিই প্রস্তুত, নাকি শুধু আয়োজনটাই হবে?
প্রকাশ: ৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪০ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৩৪৭ বার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গণতন্ত্র কি সত্যিই প্রস্তুত, নাকি শুধু আয়োজনটাই হবে?
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply