হোম / জাতীয়
জাতীয়

কৃষি ও প্রকৃতি ধ্বংসের পথে: নদ–নদীর বালু উত্তোলনের ভয়াবহ প্রভাব

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩৬ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ২৫৬৮৭ বার
কৃষি ও প্রকৃতি ধ্বংসের পথে: নদ–নদীর বালু উত্তোলনের ভয়াবহ প্রভাব


বাংলাদেশের অর্থনীতি, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নদ–নদীর সম্পর্ক চিরন্তন। কিন্তু সেই নদ–নদীই আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। নির্বিচারে ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন শুধু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকেই বাধাগ্রস্ত করছে না; ধ্বংস করে দিচ্ছে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা। যার প্রভাব প্রতিদিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে নদীর পাড়ের গ্রামগুলোর জীবন–জীবিকায়।


অবৈধ বালু উত্তোলন—এক নীরব বিপর্যয়

গত কয়েক বছরে দেশের বহু নদীই দিয়েছে অস্বাভাবিক ভাঙনের ইঙ্গিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত্রতত্র ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনই এই ভাঙনের বড় কারণ। নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু তুলে নেওয়ার ফলে পানি প্রবাহের গতি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে; ভেঙে পড়ে দুই তীর, গৃহহারা হয় হাজারো মানুষ।

অনেক নদীতে নৌ–গতি বজায় রাখার কথা বলে বালু উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে দেখা যায়—এগুলো চলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে, গভীর রাতে, প্রভাবশালী একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে। কোনো প্রকার পরিবেশ–পরিস্থিতি মূল্যায়ন ছাড়া এভাবে নদীর বুকে অত্যাচার করে কোটি টাকার বালু পাচার করা হচ্ছে প্রতিদিন।


কৃষি জমি হুমকিতে

বালু উত্তোলনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে খেত–খামারে। নদী ভাঙনে বছরে হাজার হাজার একর উর্বর জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জলধারার স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে জমিতে বাড়ছে অনিয়মিত বন্যা, আবার কোথাও দেখা দিচ্ছে পানির ঘাটতি। ফলে কৃষক তাদের বারোমাসি চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারছে না।

ফুলবাড়ীর নদী তীরের কৃষক আব্দুল মতিনের ভাষায়—
“নদীর বালু তুলতে তুলতে এমন অবস্থা হয়েছে, এখন বর্ষা এলেই জমি থাকে না। ইরি, বোরো কিছুই ঠিক মতো করতে পারি না। নদী আর আগের মতো নেই।”


জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির পথে

নদী কেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য বালু উত্তোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

  • মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে
  • নদীর তলদেশের ক্ষুদ্র প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাস ধ্বংস হচ্ছে
  • ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর চলাচল ব্যাহত হচ্ছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ কৃত্রিমভাবে গভীর হওয়ায় জোয়ার–ভাটা, জলধারার প্রকৃতি ও জলজ জীবের প্রাকৃতিক আচরণ নষ্ট হচ্ছে একেবারে মূল থেকে।


মানুষের জীবন–জীবিকায় ঝুঁকি

বালু উত্তোলন শুধু কৃষি বা প্রাণীজগতই নয়, মানুষের জীবনকেও গভীর বিপদে ফেলছে।

  • নদীপাড়ে বসবাসকারী পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে
  • স্কুল, মসজিদ, সড়কসহ বহু স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হচ্ছে
  • স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ছে
  • ভাঙনপীড়িত মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে শহরমুখী হচ্ছে

নাগেশ্বরীর নদীপাড়ের বাসিন্দা নাছিমা বেগম বলেন,
“প্রতিবছর বাড়ি সরাই। ভাঙন থামে না। ড্রেজার বন্ধ হলে হয়তো নদীটা বাঁচত।”


এভাবে চলতে থাকলে কী হবে?

পরিবেশ আইন অনুযায়ী নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সমীক্ষা, অনুমতি ও তদারকি। কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনোই প্রয়োগ নেই। যদি এখনই এই বেপরোয়া উত্তোলন বন্ধ না করা যায়, তবে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।

  • নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বদলে যাবে
  • কৃষি উৎপাদন কমে যাবে
  • জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরও বাড়বে
  • স্থায়ী নদী–ভাঙন গ্রাস করবে গ্রাম–বসতভিটা

প্রশাসন ও জনসচেতনতা—দুইয়ের সমন্বয়ই সমাধান

বিশেষজ্ঞ ও নদী–সংরক্ষণ কর্মীদের মতে, অবৈধ ড্রেজার বন্ধ, নিয়মিত নদী পর্যবেক্ষণ, নদী–ব্যবস্থাপনা নীতিমালা কঠোর বাস্তবায়ন এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করলেই এই সংকট কাটানো সম্ভব। পাশাপাশি বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারেও গুরুত্ব দিতে হবে।


শেষ কথা

নদী শুধু পানি নয়—নদী একেকটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। নদী বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে, মানুষের জীবন বাঁচবে। কিন্তু আজ সেই নদীগুলোই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বালু উত্তোলন নামক এক অমানবিক নৈরাজ্যের কারণে।

টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এখনই থামাতে হবে এই ধ্বংসযজ্ঞ।
নদীকে তার স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনা—এটাই সময়ের দাবি।

কৃষি ও প্রকৃতি ধ্বংসের পথে: নদ–নদীর বালু উত্তোলনের ভয়াবহ প্রভাব
বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!