সারাদেশে জ্বালানি তেল—ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন—সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। সরকারি বক্তব্যে বারবার বলা হচ্ছে দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; কিন্তু বাস্তবতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প বলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোটরসাইকেল, বাস, মিনিবাস ও ট্রাকের দীর্ঘ সারি আজ নিত্যদিনের দৃশ্য। এই বৈপরীত্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিতই দেয় না, বরং জনদুর্ভোগের গভীরতাও তুলে ধরে।
জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতার পেছনে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠছে তদারকির অভাব নিয়ে। অনেক পেট্রোল পাম্প মালিক রাতের আঁধারে কালোবাজারে অধিক মুনাফার আশায় জ্বালানি সরিয়ে দিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে খোলা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে চড়া মূল্য। বাজার ব্যবস্থার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পরিবহন খাতে এর প্রভাব ভয়াবহ। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহনে। এর ফলস্বরূপ প্রতিদিন বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠছে ক্রমেই দুর্বিষহ। তাদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ জমাট বাঁধছে নীরবে।
ইতিহাস বলে, যখন জনগণের ন্যায্য চাহিদা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকে, তখন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্তমান পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা বৃহত্তর সংকটের রূপ নিতে পারে—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখন সময় এসেছে বাস্তবতা স্বীকার করার। শুধু আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ—
- জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর মনিটরিং
- কালোবাজারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান
- ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
- এবং জনসাধারণকে নিয়মিত সঠিক তথ্য প্রদান
সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এই সংকট শুধু অর্থনীতির নয়, এটি জনজীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে জড়িত। তাই দ্রুত ও কার্যকর সমাধান এখন সময়ের দাবি।
দেশ আজ এক নীরব অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রয়োজন সৎ উদ্যোগ, শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। এখন দেখার বিষয়—কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এবং কতটা আন্তরিকভাবে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসে।
লেখক: সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,মহাকাল গবেষক,সমাজ সংস্কারক ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply