হোম / সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

জনদূর্ভোগই কি আন্দোলনের নাম?

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ৭০ বার

-এম এ হক


বাংলাদেশ কি আদৌ আন্দোলনের দেশ—নাকি আমরা আন্দোলনের নামে ক্রমেই জনজীবনকে জিম্মি করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি? সাম্প্রতিক সময়ে তুচ্ছ ও টুনকো বিষয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে পড়া, যান চলাচল বন্ধ করা, নাগরিক ভোগান্তি বাড়ানো—এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার—এতে কোনো দ্বিমত নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলন এদেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্দোলনের নামে জনদূর্ভোগ সৃষ্টি কি সেই গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ? আন্দোলনের লক্ষ্য যদি হয় ন্যায্য দাবি আদায়, তবে তার পদ্ধতিও হতে হবে দায়িত্বশীল, যুক্তিসংগত ও আইনসম্মত।
আজ দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সামান্য বা প্রশাসনিকভাবে সমাধানযোগ্য বিষয় নিয়েও হঠাৎ রাস্তায় নেমে পড়ে। ফলে অফিসগামী মানুষ, রোগী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়। এতে আন্দোলনের নৈতিক শক্তি যেমন ক্ষুণ্ন হয়, তেমনি সমাজে নেতিবাচক বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা। যখন-তখন মব তৈরি করে প্রশাসন, আইন বিভাগ কিংবা বিচার বিভাগকে চাপের মুখে ফেলার প্রবণতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। প্রশ্ন উঠছে—এদের কি পড়াশোনা নেই? নেই কি সচেতন অভিভাবকের দিকনির্দেশনা? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার কি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধ, আইন মেনে চলা এবং সহনশীলতার শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
গণতন্ত্রে আন্দোলন হবে, মতপ্রকাশ হবে—কিন্তু তা হতে হবে সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে। অন্যথায় আন্দোলন আর জনস্বার্থের হাতিয়ার থাকে না, তা পরিণত হয় বিশৃঙ্খলার উৎসে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র নিজেই।
দেশ কি তাহলে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে? জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি আইন অমান্য ও চাপের রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের ভিত শক্ত হবে কীভাবে?
এক্ষেত্রে দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র—সবারই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। আন্দোলনের সংজ্ঞা নতুন করে বোঝাতে হবে—যেখানে দাবি থাকবে যুক্তিনির্ভর, কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ এবং জনদূর্ভোগ নয়, জনস্বার্থই হবে মুখ্য।
আন্দোলন যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে তা আর আন্দোলন থাকে না—তা হয়ে ওঠে দায়িত্বহীনতা। এখনই সময়, আমরা যেন সেই সীমারেখাটি স্পষ্টভাবে টেনে দিই।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!