হোম / কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম

চিলমারীতে তীররক্ষা প্রকল্পের পিচিং নিয়েই প্রশ্ন! বাঁধের ঢালে নির্মাণে নকশাগত ত্রুটি, নাকি দুর্নীতি? ধসে ঝুঁকিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ

প্রকাশ: 25 July 2026, 05:18 PM পড়া হয়েছে: ৪৯ বার


মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম জুয়েল, চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কাচকোল বাজারসংলগ্ন সড়কটারী-শিমুলতলী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের একটি অংশের পিচিং (কংক্রিট ব্লক স্থাপন) নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নদীর মূল আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের পরিবর্তে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালে পিচিং নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি প্রকল্পে নকশাগত ত্রুটি নাকি দুর্নীতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে—তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঢালের নিচ থেকে নদীর তলদেশ পর্যন্ত ব্লক ডাম্পিং করা হলেও তা নদীর গভীরে পর্যাপ্তভাবে বিস্তৃত করা হয়নি। ফলে তীররক্ষা কাঠামোটি নদীর তলদেশ বরাবর তীর্যকভাবে প্রায় ৪০ ফুট অগ্রসর না হয়ে বাঁধের ঢালের নিচ থেকেই প্রায় ৪০ ফুট উঁচুতে উঠে গেছে। এতে নদীর তীব্র স্রোতের সরাসরি আঘাত থেকে মূল তীর রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
এলাকাবাসীর দাবি, বাঁধসংলগ্ন পিচিংয়ের সামনে নদীর গভীরতা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট হলেও প্রকল্পের অন্যান্য অংশে তা ৫০ থেকে ৮০ ফুটের মধ্যে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানির উচ্চতা ও স্রোত বৃদ্ধি পেলেই নদীর প্রবল স্রোত সরাসরি পশ্চিম তীরে আঘাত হানে এবং বাঁধের ঢালে নির্মিত পিচিং কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা মজনু, বাবলু, মতিয়ার ও জয়নাল জানান, চলতি মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০ মিটার ডানতীর রক্ষা বাঁধের পিচিংসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কাচকোল বাজারের উত্তরে কালিরকুড়া বাঁধ থেকে শিমুলতলী হয়ে সড়কটারীর দক্ষিণাংশ পর্যন্ত ভাঙন ও ধস অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে একটি মডেল স্টাডি পরিচালিত হয়। ওই সমীক্ষায় উঠে আসে, ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশ প্রতি কিলোমিটারে পশ্চিম দিকে গড়ে প্রায় ৭ সেন্টিমিটার ঢালু হওয়ায় নদীর প্রবল স্রোতের কারণে পশ্চিম তীরে ভাঙনের ঝুঁকি বেশি। সেই গবেষণার ভিত্তিতেই পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীর রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
সচেতন মহল ও স্থানীয়দের ধারণা, প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের সময় নদীর প্রকৃত গভীরতা ও স্রোতের গতিপ্রকৃতিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্লক ডাম্পিং না করা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা কাজের গুণগত ত্রুটির কারণেও নদীর তলদেশে ক্ষয় সৃষ্টি হয়ে প্রতিবছর পিচিং ধসে পড়ছে।
চিলমারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারী সরকার অভিযোগ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই পিচিং ধসে পড়তে শুরু করেছে। ফলে প্রতিবছর একই স্থান সংস্কারে সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার শিরিন বলেন, প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল নদীভাঙন থেকে জনপদকে স্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে যেখানে ব্লক ধসে যাচ্ছে এবং বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে, সেখানে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রকল্পটির কারিগরি নকশা, নির্মাণমান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!