হোম / ঢাকা
ঢাকা

শিক্ষককে শেকল পরিয়ে শিক্ষা সংস্কার?

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:০৬ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ৪৪০ বার
শিক্ষককে শেকল পরিয়ে শিক্ষা সংস্কার?
শিক্ষককে শেকল পরিয়ে শিক্ষা সংস্কার?


রাষ্ট্র যখন শিক্ষকদের কথা বলে, তখন উচ্চকণ্ঠে বলে—শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। অথচ বাস্তব নীতিনির্ধারণে সেই শিক্ষকদেরই বারবার শেকলে বাঁধা হচ্ছে। এমপিও নীতিমালা-২০২৫ তারই সর্বশেষ প্রমাণ। একটি মাত্র ধারা—১১.১৭—আজ হাজারো শিক্ষক-সাংবাদিককে জীবিকা, মর্যাদা ও মতপ্রকাশের অধিকার হারানোর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রশ্নটা সোজা—শিক্ষক কি কেবল শ্রেণিকক্ষে বন্দি একটি পেশাগত সত্তা? নাকি তিনি সমাজের সচেতন নাগরিক, যাঁর চিন্তা, লেখা ও প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে? শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করলেই যদি একজন শিক্ষক অপরাধী হয়ে যান, তবে এই রাষ্ট্র আসলে কোন ধরনের নাগরিক চায়?
নীতিমালায় বলা হচ্ছে, শিক্ষকতার বাইরে যে কোনো ‘আর্থিক লাভজনক’ কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। অথচ একই রাষ্ট্র শিক্ষকদের এমন কোনো সম্মানজনক বেতন কাঠামো দিতে পারেনি, যা দিয়ে একজন শিক্ষক পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে বাঁচতে পারেন। এ অবস্থায় শিক্ষকরা যদি অতিরিক্ত আয় নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন—তাহলে তা কি অপরাধ?
আরও ভয়ংকর হলো—এই ধারা সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। শিক্ষক-সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতের অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অবহেলা তুলে ধরেছেন। নতুন নীতিমালা কি সেই কণ্ঠরোধেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ? অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা শিক্ষকদের চুপ করিয়ে দেওয়াই কি এর উদ্দেশ্য?
নীতিনির্ধারকদের কাছে আরেকটি প্রশ্ন—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে? শিক্ষক সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ—কারও মতামত কি নেওয়া হয়েছিল? নাকি এটি কাগজে কলমে তৈরি করা আরেকটি আদেশ, যার বোঝা বইতে হবে মাঠপর্যায়ের শিক্ষককে?
শিক্ষা সংস্কার কখনো ভয় দেখিয়ে হয় না। শাস্তির হুমকি দিয়ে গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষককে নিরাপত্তাহীন করে, আতঙ্কিত করে, বিকল্প চিন্তার পথ রুদ্ধ করে কোনো উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না। বরং এতে করে জন্ম নেয় এক ধরনের নীরবতা—যা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এই নীতিমালা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষকতার মূল দায়িত্বে ব্যাঘাত না ঘটায়—এমন পেশাকে ‘অপরাধ’ বানানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নইলে আজ শিক্ষক-সাংবাদিক, কাল হয়তো শিক্ষক-লেখক, শিক্ষক-গবেষক—একদিন শিক্ষক শুধু শিক্ষকই থাকবে, কিন্তু চিন্তাহীন এক কর্মচারীতে পরিণত হবে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, তবে প্রথমেই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। শেকল নয়—শিক্ষকের দরকার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সম্মান। এমপিও নীতিমালার এই ধারা সেই মৌলিক সত্যেরই বিরোধিতা করছে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!