হোম / অপরাধ
অপরাধ

ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: বিচার না পাওয়ার হতাশা, সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি আরও জোরালো

প্রকাশ: ৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৯ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ২৬ বার


কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের হত্যার ১৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল বুধবার। দীর্ঘ দেড় যুগ পার হলেও আজও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভে দিন কাটাচ্ছে ফেলানীর পরিবার। একই সঙ্গে সীমান্তে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বন্ধের দাবিও নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্যের গুলিতে নিহত হন মাত্র ১৩ বছর বয়সী ফেলানী খাতুন। তিনি নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারি গ্রামের নুরুল ইসলাম নুরু ও জাহানারা বেগমের কন্যা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারের অভাব-অনটন ঘোচাতে প্রায় ১২ বছর আগে দেড় বছরের শিশু ফেলানীকে কোলে নিয়ে স্ত্রীসহ অবৈধ পথে ভারতে যান নুরুল ইসলাম নুরু। ভারতের আসামের বঙ্গাইগাঁও জেলায় বসবাস করে ইটভাটা ও বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকের কাজ করতেন তারা। একপর্যায়ে ফেলানী কিশোরী হলে বাংলাদেশে তার বিয়ে ঠিক হয়। সেই বিয়ের উদ্দেশ্যেই ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি মাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার পথে সীমান্ত দালালদের সহায়তায় কাঁটাতার পার হওয়ার চেষ্টা করেন তারা। মা জাহানারা মেয়েকে বিয়ের সাজও পরিয়ে দেন।
পরদিন ৭ জানুয়ারি ভোরে অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে প্রথমে কাঁটাতার পার হন নুরু। এরপর ফেলানী উপরে উঠতেই ভারতের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের এক বিএসএফ সদস্য খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে পড়ে ফেলানীর নিথর দেহ। প্রায় চার ঘণ্টা পর বিএসএফ মরদেহ নামিয়ে নেয় এবং একদিন পর ময়নাতদন্ত শেষে বিজিবির মাধ্যমে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারের জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে মামলার বিচার শুরু হয়। ওই মামলায় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু ও মামা হানিফ সাক্ষ্য দেন। তবে ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানায় পরিবার। ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হলেও ২০১৫ সালের ২ জুলাই আবারও অমিয় ঘোষ খালাস পান।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সংস্থা ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একাধিকবার শুনানি পেছানো হয়। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির দিন ধার্য থাকলেও করোনা মহামারির কারণে আজ পর্যন্ত মামলার কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নুরু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়েকে হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেল, আজও বিচার পেলাম না। সীমান্তে এখনও মানুষ মারা যাচ্ছে। আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। আমার মেয়েকে হত্যার বিচার হলে সীমান্তে আর কাউকে হত্যার সাহস পাবে না বিএসএফ। জীবিত থাকতে আমি আমার মেয়ের বিচার দেখে যেতে চাই।”
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “যে সরকারই আসুক, তারা যেন আমার মেয়েকে হত্যার বিচার করে। আমাদের ভরণপোষণ ও সন্তানদের কর্মসংস্থানের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। বিচার ও নিরাপত্তাই আমাদের একমাত্র দাবি।”
ফেলানীর ছোট ভাই আক্কাছ আলী বলেন, “আমি তখন ছোট ছিলাম। আজও বাবা-মা কাঁদেন। ভাই হিসেবে আমার একটাই দাবি—আমার বোনের হত্যার বিচার চাই।”
স্থানীয় প্রতিবেশী শরীফ মিয়া বলেন, “১৫ বছর ধরে ফেলানী হত্যার বিচার ঝুলে আছে। যে সরকারই আসুক, ফেলানীর বিচার নিশ্চিত করা উচিত।”
এ বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন জাহান লুনার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এখনো কোনো কর্মসূচির নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা এলে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!