হোম / অপরাধ
অপরাধ

সাংবাদিকতার পরিচয়ে অবাধ অপব্যবহার: পেশার মর্যাদা রক্ষায় চাই কঠোর আইন ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।সাংবাদিকতা কি এখন পরিচয়পত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার?

প্রকাশ: 5 November 2026, 12:43 AM পড়া হয়েছে: ২১ বার

মনজুরুল ইসলাম

সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট পেশা। রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী মহল কিংবা সমাজের যেকোনো ক্ষমতাবান শ্রেণির অনিয়ম, দুর্নীতি, অনিয়ায় ও ক্ষমতার অপব্যবহার জনসমক্ষে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একজন প্রকৃত সাংবাদিক প্রতিদিন তথ্য সংগ্রহ করেন, ঘটনাস্থলে যান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করেন, তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেন এবং সত্যনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করেন।

কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সাংবাদিকতার পেশাগত পরিচয় ও মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সাংবাদিকতার মৌলিক জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বাইরে থেকেও অনেকে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রচার চালাচ্ছেন, কেউ টিকটক কিংবা বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরি করছেন, কেউ রাজনৈতিক দলের প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। আবার কারও বিরুদ্ধে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—সাংবাদিকতা কি একটি দায়িত্বশীল পেশা, নাকি যে কেউ একটি পরিচয়পত্র তৈরি করেই সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করতে পারবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা, পেশাগত যোগ্যতা, আইনগত কাঠামো, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সাংবাদিকতা: পেশা, দায়িত্ব নাকি ব্যক্তিগত পরিচয়ের ব্যবসা?

সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি তথ্যনির্ভর, অনুসন্ধানমূলক ও জনকল্যাণমুখী পেশা। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, ঘটনার সত্যতা নিরূপণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, জনস্বার্থ বিশ্লেষণ এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশন—এসবই সাংবাদিকতার মৌলিক উপাদান।

একজন পেশাদার সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হলো সত্যের অনুসন্ধান করা। তিনি কোনো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবাদ প্রকাশ করেন না। তাঁর দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে, সত্যের কাছে এবং পেশাগত নৈতিকতার কাছে।

অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয়কে সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক স্বার্থ, ব্যবসায়িক সুবিধা কিংবা আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, ভিডিও প্রতিবেদন, লাইভ সম্প্রচার কিংবা টিকটকভিত্তিক সংবাদ উপস্থাপন আধুনিক সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে। মাধ্যম নয়, বরং কনটেন্টের উদ্দেশ্য, তথ্যের সত্যতা, পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও নৈতিক আচরণই সাংবাদিকতার মান নির্ধারণ করবে।

সাংবাদিকতার নামে অপরাধ: আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়

সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সাংবাদিক পরিচয় কোনো অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না। কোনো গণমাধ্যমের পরিচয়পত্র, প্রেস কার্ড কিংবা সাংবাদিক সংগঠনের সদস্যপদ কাউকে আইনগত দায়মুক্তি প্রদান করে না।

বিশেষ করে মাদক ব্যবসা, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র, প্রতারণা, চাঁদাবাজি কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে একটি মৌলিক আইনি নীতি অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে—অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হলে তদন্ত, বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনসম্মত নয়।

কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

বাংলাদেশের সংবিধান কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধান সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান আইনগত ভিত্তি।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্‌স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ২(খ) উপধারায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি ও অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনসম্মত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে অপরাধের বিচার ও দণ্ডসংক্রান্ত মৌলিক সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। আর ৪০ অনুচ্ছেদে আইন দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা সাপেক্ষে বৈধ পেশা বা জীবিকা গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত।

অর্থাৎ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিক অধিকার, তেমনি পেশাগত দায়িত্ব ও আইনগত জবাবদিহিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন একটি আইনগত কাঠামো তৈরি করা, যাতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে এবং পেশার পরিচয়ের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়।

প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪: বিদ্যমান আইনি কাঠামো কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের মান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন হলো প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪।

এই আইনের ১১ ধারায় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের উদ্দেশ্য হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মান উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।

একই ধারায় সাংবাদিকদের জন্য উচ্চ পেশাগত মানসম্পন্ন আচরণবিধি প্রণয়ন, সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি এবং সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইনের ১২ ধারায় সাংবাদিকতার নৈতিকতা বা আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে তদন্তের পর সতর্ক, তিরস্কার কিংবা নিন্দা জানানোর ক্ষমতা প্রেস কাউন্সিলকে দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা ও সাংবাদিকদের জন্য ১৯৯৩ সালে প্রণীত এবং ২০০২ সালে সংশোধিত আচরণবিধি রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এতদিনের আইন ও আচরণবিধি থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পেশাগত বিশৃঙ্খলা কেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না?

সমস্যার একটি জায়গা হতে পারে বাস্তবায়ন, তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং ডিজিটাল গণমাধ্যমের পরিবর্তিত বাস্তবতা। ১৯৭৪ সালের আইনি কাঠামোর পাশাপাশি বর্তমান সময়ের অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ভিডিও সাংবাদিকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার জন্য আরও সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

সাংবাদিক হতে কি শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত?

এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।

সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন সাংবাদিককে সংবিধান, প্রচলিত আইন, মানবাধিকার, তথ্য অধিকার, প্রশাসনিক কাঠামো, অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদন, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ লেখার নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখতে হয়।

তবে শুধু উচ্চশিক্ষিত হলেই একজন ভালো সাংবাদিক হওয়া যায় না। আবার কম শিক্ষিত হলেই কেউ সাংবাদিকতার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তও ন্যায়সংগত নয়।

অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, সততা, সাহসিকতা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তাই সাংবাদিকতার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য শিক্ষাগত মান নির্ধারণের পাশাপাশি বিকল্প যোগ্যতা হিসেবে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত কাজের নমুনা ও দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে উপজেলা, ইউনিয়ন, চরাঞ্চল, সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য সহজলভ্য প্রশিক্ষণ এবং স্বীকৃত সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

সক্রিয় দলীয় রাজনীতি ও সাংবাদিকতা: স্বার্থের সংঘাত কোথায়?

সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন।

কোনো সাংবাদিক যদি একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদধারী হন এবং সেই দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।

এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা এবং সক্রিয় দলীয় দায়িত্ব পালন—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত বা নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক অধিকার থাকতে পারে। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে আইনসাপেক্ষে সংগঠন করার অধিকারও স্বীকৃত। তাই শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে সাংবাদিকতা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।

তবে কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা, প্রচারক বা সক্রিয় সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁর সংবাদকর্মের নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে সুস্পষ্ট পেশাগত নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

প্রয়োজনে সংবাদ সম্পাদনা, রাজনৈতিক দায়িত্ব প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ কাভারেজ থেকে বিরত থাকা কিংবা দায়িত্ব পৃথক রাখার বিধান করা যেতে পারে।

সাংবাদিকতা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্রে পরিণত না হয়, আবার রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকারও যেন অযৌক্তিকভাবে খর্ব না হয়—নীতিমালার লক্ষ্য হওয়া উচিত এই ভারসাম্য।

প্রেস কার্ডের অপব্যবহার বন্ধ হবে কীভাবে?

বর্তমানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের নামে পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রেস কার্ড থাকলেই কেউ আইনগতভাবে স্বীকৃত বা পেশাদার সাংবাদিক হয়ে যান না।

প্রেস কার্ড মূলত সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের দেওয়া পরিচয়পত্র। এর বৈধতা, দায়িত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে গণমাধ্যমটির প্রকৃত অস্তিত্ব, নিয়োগ বা সম্পৃক্ততার সত্যতা এবং পরিচয়পত্রের যথার্থতার ওপর।

এ কারণে জাতীয় পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক তথ্যভান্ডার বা ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে সাংবাদিকের নাম, কর্মরত গণমাধ্যম, পদবি, কর্মস্থল, নিয়োগ বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ, কাজের অভিজ্ঞতা এবং পরিচয়পত্রের মেয়াদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

তবে এই ডাটাবেজ যেন সরকারি অনুমোদন ছাড়া সাংবাদিকতা করার অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার না হয়। নিবন্ধন ও স্বীকৃতির প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, সহজ, আপিলযোগ্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।

প্রস্তাবিত জাতীয় সাংবাদিকতা নীতিমালায় যা থাকা জরুরি

সাংবাদিকতার পেশাগত মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত জাতীয় সাংবাদিকতা নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

১. জাতীয় সাংবাদিক নিবন্ধন ও তথ্যভান্ডার: সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন ও অন্যান্য স্বীকৃত গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য যাচাইযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গঠন।

২. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ: সাংবাদিকতার মৌলিক জ্ঞান, সংবাদ লেখা, তথ্য যাচাই, আইন, নৈতিকতা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক বা পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করা। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের জন্য সমমানের দক্ষতা মূল্যায়নের সুযোগ রাখা।

৩. গণমাধ্যমের বৈধতা যাচাই: যে প্রতিষ্ঠানের নামে সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, সম্পাদকীয় কাঠামো, নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ এবং দায়িত্বশীলতা যাচাই করা।

৪. পরিচয়পত্রের অপব্যবহার প্রতিরোধ: ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি, অন্য প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার, পরিচয়পত্র বিক্রি এবং সাংবাদিকতার পরিচয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

৫. রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত নিরসন: সক্রিয় দলীয় পদ-পদবি ও সাংবাদিকতার দায়িত্বের মধ্যে স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাত নিরসনের বিধান।

৬. অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি: সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মাদক ব্যবসা কিংবা অন্য অপরাধ সংঘটিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।

৭. সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা: সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলা, হুমকি, হয়রানি, মিথ্যা মামলা ও বেআইনি বাধা থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া।

৮. বেতন ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা: গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, বেতন, ছুটি, কর্মঘণ্টা ও অন্যান্য প্রযোজ্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা।

৯. ডিজিটাল সাংবাদিকতার স্বীকৃতি: অনলাইন, ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে যুগোপযোগী নীতিমালার আওতায় আনা।

১০. অভিযোগ নিষ্পত্তি ও আপিল ব্যবস্থা: সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘন, ভুয়া পরিচয়, অপসাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের হয়রানির অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

১১. নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা: কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, অনলাইন নিপীড়ন ও বৈষম্য প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

১২. সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংরক্ষণ: সরকারের সমালোচনা, দুর্নীতি অনুসন্ধান কিংবা জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক যাতে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা।

নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হবে স্বাধীন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়

এখানে একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। সাংবাদিকতার মান নিয়ন্ত্রণের নামে যদি সরকার সরাসরি সাংবাদিকদের পেশাগত অনুমোদন, সংবাদ প্রকাশ কিংবা সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পেয়ে যায়, তাহলে তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান। তাই প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা হতে হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর, আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা যেতে পারে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল সাংবাদিকতা এবং নতুন ধরনের গণমাধ্যমকে এর কার্যকর আওতায় আনার বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এই ব্যবস্থায় সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম মালিক, আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।

কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত, লিখিত নোটিশ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত এবং আপিলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন আছে, সাংবাদিক সমাজেরও দায় রয়েছে

সাংবাদিকতার বর্তমান সংকটের জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করলে চলবে না। সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক, গণমাধ্যম মালিক এবং পেশায় নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তিরও দায়িত্ব রয়েছে।

একটি গণমাধ্যমের সম্পাদককে অবশ্যই জানতে হবে, তাঁর প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র কারা ব্যবহার করছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাস্তবে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত কি না।

নিয়োগ বা প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই, কর্মপরিধি নির্ধারণ, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন।

একইভাবে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। শুধু পরিচিতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে সদস্যপদ দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রকৃত সাংবাদিকদেরও নিজেদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সাংবাদিকতার নামে কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সংগঠনগত পরিচয় দিয়ে তাঁকে রক্ষা করা উচিত নয়।

উপসংহার: সাংবাদিকতার পরিচয় নয়, প্রমাণ হোক পেশাগত দায়িত্ব

সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম নয়। এটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সমাজের সত্য তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয় তাঁর প্রেস কার্ডের আকারে নয়; তাঁর পরিচয় তাঁর প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধান, সততা, দায়িত্বশীলতা এবং জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতায়।

যে সাংবাদিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখেন, তাঁকে হয়রানি করা যাবে না। যে সাংবাদিক ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন, তাঁর কণ্ঠরোধ করা যাবে না। একই সঙ্গে যে ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ, প্রতারণা, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেন, তাঁকেও কোনো ধরনের পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না।

সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা বন্ধ করা যেমন জরুরি, তেমনি অপসাংবাদিকতা বন্ধের অজুহাতে প্রকৃত সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

অতএব, সরকারকে প্রেস কাউন্সিল আইন ও বিদ্যমান আচরণবিধির কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী জাতীয় সাংবাদিকতা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি একটি স্বচ্ছ জাতীয় সাংবাদিক তথ্যভান্ডার, প্রশিক্ষণব্যবস্থা, পেশাগত স্বীকৃতি এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমরা এমন সাংবাদিকতা চাই, যেখানে পরিচয়ের দাপট নয়—যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে; রাজনৈতিক প্রভাব নয়—সত্যের প্রাধান্য থাকবে; ব্যক্তিস্বার্থ নয়—জনস্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এখনই সময় সাংবাদিকতার শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর আইনগত সংস্কারের।

সাংবাদিকতা হোক সত্যের পক্ষে, জনগণের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

লেখক:সাংবাদিক, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক, মহাকাল গবেষক, মানবাধিকার কর্মী।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!