হোম / কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রাম

সেতুর অভাবে চরম ভোগান্তি শালজোড়ের মানুষের

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ৮০ বার

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকার কয়েক হাজার মানুষ একটি সেতুর অভাবে যুগের পর যুগ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। কালজানী নদী দ্বারা দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এ জনপদের মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা যেন থমকে আছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বারোমাসই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর এমনকি জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রবীণ বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, “আমাদের বাপ-চাচারা পাল তোলা নৌকায় নদী পার হতেন, এখনো আমরা সেই নদীই পার হচ্ছি ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। এত বছরে একটা ব্রিজও হলো না।”

শিক্ষা ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। আব্দুল মোতালিব বলেন, “প্রতিদিন নদী পারাপারের ঝুঁকি ও যাতায়াত সমস্যার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে শিশুদের পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নৌকায় নদী পাড়ি দিতে হয়। বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা প্রাথমিকের পরেই থেমে যাচ্ছে, যা বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষক আব্দুল খালেক জানান, ফসল বাজারে নিতে অতিরিক্ত খরচ হয় এবং পরিবহণ সংকটে কম দামে বিক্রি করতে হয়। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক ইউপি সদস্য ইসরাফিল হোসেন বলেন, “রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় ঘাটেই রোগীর মৃত্যু হয়।” এছাড়া নৌকা ডুবিসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটে বলে জানান তারা।

নৌযান সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগও রয়েছে। সাইফুর রহমান বলেন, “জরুরি সময়ে নদী পার হতে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া গুনতে হয়। কখনো কখনো ১০ টাকার ভাড়া ৫০০-১০০০ টাকাও দিতে হয়।”

সামাজিক জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। আব্দুল মালেক জানান, যাতায়াত সমস্যার কারণে অনেকেই এ এলাকার মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে চান না, ফলে বিয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সীমান্তবর্তী হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মামুন বলেন, “আমাদের এলাকা তিনদিকে নদী আর একদিকে ভারত। সীমান্তে উত্তেজনা হলে আমরা আতঙ্কে থাকি।”

অবকাঠামোগত উন্নয়নেও পিছিয়ে রয়েছে শালজোড়। আবু সাইদ বলেন, সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়নি। পরিবহনের জন্য এখনো ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলের উপর নির্ভর করতে হয়।

অগ্নিকাণ্ড বা বড় দুর্ঘটনার সময়ও দ্রুত সেবা পাওয়া যায় না বলে জানান আব্দুস সালাম। “ফায়ার সার্ভিস বা জরুরি সহায়তা সময়মতো পৌঁছাতে পারে না, ফলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে,” বলেন তিনি।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নদী বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবিটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আনা হবে।

স্থানীয়দের জোর দাবি, কালজানী নদীর ওপর দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করা হলে শালজোড়সহ আশপাশের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে এবং অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!