বিশেষ প্রতিনিধি:
উপকূলীয় জনপদের নদীবেষ্টিত জীবনে যেমন জোয়ার–ভাটার ছন্দ আছে, তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতেও রয়েছে পরিবর্তনের ঢেউ। ভৈরব নদীর পাড়ে বসবাসকারী একজন সাধারণ মানুষের চোখে বিশ্ব কূটনীতি ও দেশের ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রতিফলন যেন বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
দেশ যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে, ঠিক সেই সময় ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বেন্ট্র টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বাংলাদেশের জন্য নতুন মুখ নন। অতীতেও ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা এই কূটনীতিক দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এবং মার্কিন সিনেটের মনোনয়ন শুনানিতে বাংলাদেশকে ‘দশকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মুখোমুখি দেশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মন্তব্য কোনো হুমকি বা নির্দেশ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়। তবে বর্তমান রাষ্ট্রদূত বাস্তববাদী কূটনীতির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ভারত–চীন–রাশিয়ার আঞ্চলিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-কেন্দ্রিক কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেবে না; বরং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতেই আগ্রহী। এ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চীন, ভারত ও রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও অভিবাসন নীতি বিশ্বজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব—সবকিছু মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষ কূটনীতির জটিলতা বোঝে না; তারা বোঝে বাজারদর, নিত্যপণ্যের মূল্য ও জীবিকার নিশ্চয়তা। কিন্তু সেই বাজার, রপ্তানি ও অর্থনীতির পেছনেও যে কূটনীতি কাজ করে—সেটিই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ।
মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই বাজারে প্রবেশ ও অবস্থান ধরে রাখতে কূটনৈতিক দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ অতীতে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে দেশের কূটনৈতিক নীতিকে নতুনভাবে সাজাতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, সফল কূটনীতির মাধ্যমেই একটি অঞ্চল বা রাষ্ট্র বিশ্বে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার মূল চাবিকাঠি হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি।
সবশেষে বিশ্লেষকদের অভিমত—কূটনীতিতে যতটা সফলতা অর্জন করা যাবে, দেশের উন্নয়ন ততটাই গতিশীল হবে। কূটনীতি হবে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার।
কুড়িগ্রাম
কূটনীতিই হবে দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫০ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৮ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply