মনজুরুল ইসলাম
উত্তরের জনপদে শীত নামে ধীরে, কিন্তু আঘাত করে নির্মমভাবে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডা বাতাসে যখন মানুষ কোনোভাবে কম্বল জড়িয়ে রাত পার করছে, তখন উঠানের কোণে বাঁধা গরু, ছাগল আর ভেড়াগুলো সারারাত দাঁড়িয়ে কাঁপছে—নীরবে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
ভোরের আলো ফোটার আগেই কুয়াশার ভেতর দেখা যায়, পশুগুলোর নিশ্বাসে ধোঁয়া উঠছে। শীতের ভয়ে তারা গা জড়োসড়ো করে দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলতে না পারলেও তাদের চোখে স্পষ্ট অসহায়তা। এই প্রাণগুলো শুধু পশু নয়—এরা গ্রামীণ জীবনের ভরসা, দুধ, মাংস আর জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এক প্রান্তিক খামারি ভারী কণ্ঠে বলেন,
“মানুষ কষ্টে থাকলে কাউকে না কাউকে বলে। কিন্তু আমার গরুগুলো সারারাত কাঁপে—ওদের কষ্ট বলার কেউ নেই।”
অতিরিক্ত শীতে গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। দুধ উৎপাদন কমছে, দেখা দিচ্ছে শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও নিউমোনিয়ার মতো রোগ। চিকিৎসা ও শীতনিবারণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পরিবার বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শীত মানেই চরাঞ্চলে কাজের সংকট। আয় কমে গেলে প্রথমেই বাদ পড়ে পশুর যত্ন। পুরোনো বস্তা, ছেঁড়া কাপড় আর খড় দিয়েই ঠেকানো হচ্ছে হিমেল বাতাস। গোয়ালঘরে নেই উষ্ণতার নিশ্চয়তা, নেই পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময় গবাদি পশুর জন্য শুকনো খড়ের বিছানা, বাতাসরোধী আশ্রয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে দরিদ্র মানুষের জীবিকায়।
শীত শুধু একটি ঋতু নয়—এটি নীরব দুর্যোগ। মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুর কষ্ট উপেক্ষা করলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়বে।
এই শীতে তাই প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টি।
মানুষের পাশাপাশি নীরব প্রাণগুলোর দিকেও একটু তাকানো জরুরি।
কারণ ওদের কাঁপুনির মধ্যেই লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার বেঁচে থাকার গল্প।
**লেখক,সাংবাদিক,গবেষক,সমাজ সংস্কারক ও মানবাধিকার কর্মী**


Leave a Reply