ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান সামনে রেখে সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ‘কৃষকের অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ধান সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও মাঠ পর্যায়ে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুড়িগ্রামের শস্যভান্ডারখ্যাত ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অসংখ্য কৃষক এখনো জানেন না সরকারি এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে কীভাবে ধান বিক্রি করতে হয়। অনেকের নেই স্মার্টফোন, কেউ জানেন না আবেদন পদ্ধতি, আবার কেউ শুনেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন—সরকার নাকি এখন অ্যাপে ধান কিনছে!
উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের এই ডিজিটাল ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে প্রচারণা থাকলেও অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষকের কাছে তা কার্যত অজানা। ডিজিটাল পদ্ধতির নামে কৃষকদের এক ধরনের জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মুখোমুখি করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃত কৃষকদের বড় একটি অংশ শুরুতেই বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ধরা হয়েছে ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা। অথচ বাস্তবে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ধান বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে।
সরকারি নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে চলতি মাসের ৫ মে থেকে, যা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। তবে মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক এখনো জানেন না কীভাবে গুগল প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করতে হয়, কীভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র, কৃষি কার্ড ও জমির তথ্য দিয়ে আবেদন করতে হয়।
পাইকেরছড়া ইউনিয়নের গছিডাঙা গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী ও কফিলুর রহমান বলেন, “শুনেছি সরকার অ্যাপের মাধ্যমে ধান কিনবে। কিন্তু এই অ্যাপ কীভাবে চালাতে হয়, তা জানি না।”
একইভাবে উত্তর ধলডাঙা গ্রামের কৃষক শাহিন মিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “সরকার অ্যাপে ধান কিনবে—এমন কথা এই প্রথম শুনলাম। আমাদের গ্রামের অনেক কৃষকই এ বিষয়ে কিছু জানেন না।”
অন্যদিকে তিলাই ইউনিয়নের পশ্চিম ছাট গোপালপুর গ্রামের কৃষক মাইদুল ইসলামের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন, “খাদ্য গুদামে শুকনা ধান ছাড়া নেয় না। টানা বৃষ্টিতে ধান শুকাতে পারিনি। বাধ্য হয়ে ৬৫ মণ ভেজা ধান ৭২০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। গুদামে ধান দিতে গেলেও নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।”
তবে জয়মনিরহাট খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম কৃষকদের হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এমন কোনো অভিযোগ আমার কাছে আসেনি।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কৃষকদের ভোগান্তি ও অনিয়ম ঠেকাতে ২০১৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এই অ্যাপ চালু করে খাদ্য বিভাগ। পরে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিতের আগে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত না করায় প্রান্তিক কৃষকরা কার্যত ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৪১ মেট্রিক টন। অথচ সরকারি ক্রয়ের পরিমাণ মাত্র ১ হাজার ৬৮৩ মেট্রিক টন—যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হামিদুল ইসলাম দাবি করেন, কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং মাঠ পর্যায়ে সহায়তা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—যে অঞ্চলের অসংখ্য কৃষকের হাতে এখনো স্মার্টফোন নেই, যেখানে নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জটিলতা নিত্যদিনের সমস্যা, সেখানে পুরো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্ভরশীল করা কতটা বাস্তবসম্মত?
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কৃষকের জন্য ঘোষিত সরকারি সুবিধা যদি কৃষকের কাছেই পৌঁছাতে না পারে, তবে ডিজিটাল পদ্ধতির এই উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। প্রান্তিক কৃষকের বাস্তবতা বিবেচনায় সহজ ও সরাসরি নিবন্ধন পদ্ধতি চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply