মনজুরুল ইসলাম
১৪ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’—বাংলাদেশে এটি আর নিছক একটি সামাজিক উৎসব নয়; এটি একটি পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতীক। ইহুদি–খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এই দিবসটি পশ্চিমা বিশ্বে জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ঐতিহ্যনির্ভর সমাজে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে—যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে আমাদের নৈতিকতা, সামাজিক শালীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর।
বিদেশি সংস্কৃতির নিঃশব্দ দখলদারিত্ব
বাংলাদেশের হাজার বছরের সামাজিক কাঠামো পরিবারকেন্দ্রিক, মূল্যবোধনির্ভর ও শালীনতাভিত্তিক। অথচ ১৪ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহরের পার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা ও প্রকাশ্য স্থানে যে আচরণ দেখা যায়, তা আমাদের সমাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভালোবাসার নামে বেহায়াপনা, সম্পর্কের নামে দায়িত্বহীনতা এবং স্বাধীনতার নামে নৈতিক সীমালঙ্ঘন—সবকিছুই এই দিবসকে কেন্দ্র করে উসকে দেওয়া হয়।
বাণিজ্যিক স্বার্থ ও ভোগবাদী প্ররোচনা
এই দিবসের পেছনে যে বৃহৎ বাণিজ্যিক স্বার্থ কাজ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফুল, উপহার, রেস্টুরেন্ট, বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে ভালোবাসাকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যে অনুভূতি সারাবছর দায়িত্ব ও সম্মানের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার কথা, সেটিকে কেন একটি বিদেশি দিবসের হাতে জিম্মি করা হবে?
ধর্মীয় ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলে। ইসলামী সংস্কৃতিতে ভালোবাসা অস্বীকার করা হয় না; বরং তা বৈধ সম্পর্ক, পরিবার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ভেতরে সুসংহতভাবে সংরক্ষিত। ১৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক উদযাপন সেই কাঠামোর বাইরে গিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে—বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে।
রাষ্ট্রের নীরবতা: প্রশ্নবিদ্ধ দায়িত্ববোধ
অথচ প্রতি বছর এই দিবস ঘিরে সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক বিতর্ক ও আপত্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও রাষ্ট্র কার্যকর অবস্থান নেয় না। যেভাবে মাদক, জুয়া বা অশ্লীলতা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ করা হয়, ঠিক সেভাবেই সাংস্কৃতিক শালীনতা রক্ষায়ও রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। সংস্কৃতির নামে যা কিছু চলে, সবই গ্রহণযোগ্য—এই উদাসীন নীতি একটি জাতিকে ধীরে ধীরে শিকড়ছাড়া করে।
নিষেধাজ্ঞা কেন অনিবার্য
১৪ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ করার দাবি কোনো সংকীর্ণতা নয়; এটি আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই। রাষ্ট্র যদি নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় আগ্রহী হয়, তবে এই দিবসের প্রকাশ্য উদযাপনে স্পষ্ট ও কার্যকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই সময়ের দাবি।
শেষ কথা
ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে বন্দি নয়, কোনো বিদেশি সংস্কৃতির লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিষয়ও নয়। ভালোবাসা দায়িত্ব, শালীনতা ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত—আর সেই ভালোবাসা রক্ষার জন্যই ১৪ ফেব্রুয়ারির মতো সাংস্কৃতিক আমদানির বিরুদ্ধে এখনই দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক, মহাকাল গবেষক, প্রাবন্ধিক, সমাজ সংস্কারক।
আইন ও পরামর্শ
১৪ ফেব্রুয়ারি: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নীরব হাতিয়ার—বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা এখন সময়ের দাবি
প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৭৮ বার
১৪ ফেব্রুয়ারি: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নীরব হাতিয়ার—বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা এখন সময়ের দাবি
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply