হোম / কৃষি ও প্রকৃতি
কৃষি ও প্রকৃতি

সুন্দরবনের গোলগাছ ও গোলফল: উপকূলের জীবন, জীবিকা ও সম্ভাবনার গল্প

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৪২ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ২৩৫৭৭ বার

ডুমুরিয়া–কয়রা অঞ্চলে লবণাক্ত জমিতে অর্থনৈতিক সম্পদের হাতছানি


খুলনা প্রতিনিধিঃ
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের এক অনন্য পামজাতীয় উদ্ভিদ গোলগাছ, যার ফল স্থানীয়ভাবে পরিচিত গোলফল নামে। তালের শাঁসের মতো দেখতে ও স্বাদে মিষ্টি এই ফল শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। ভিটামিন, খনিজ উপাদান, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ গোলফল লোকজ চিকিৎসাতেও বহুল ব্যবহৃত।
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা ও ডুমুরিয়া অঞ্চলের নদীপারের গ্রামগুলোতে হাঁটলে চোখে পড়ে ঝাড় আকারে গজিয়ে ওঠা গোলপাতা। শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদী পার হলেই যেন সুন্দরবনের সবুজ ছায়া এসে মিশে গেছে জনপদের চরভূমিতে। গোলপাতার ফাঁক গলে তালের কাঁদির মতো থোকা থোকা ঝুলে থাকে গোলফল।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন থেকে জোয়ারের ঢেউয়ে ভেসে আসা গোলফল লোকালয়ের চরভূমিতে আটকে অঙ্কুরিত হয় এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন গোলগাছ। শাখাহীন এই উদ্ভিদের কাণ্ড থাকে মাটির নিচে, ওপরে ছড়িয়ে পড়ে নারকেলপাতার মতো লম্বা সবুজ পাতা। গাছের গোড়ায় ধরে কাঁদি কাঁদি ফল। প্রতিটি কাঁদিতে ৫০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত ফল থাকে।
সুন্দরবনে সারা বছরই গোলগাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। তবে আষাঢ় মাসে ফলন সবচেয়ে বেশি হয়। অপরিপক্ব অবস্থায় ফল কালচে-বাদামি রঙের হয়। তিন থেকে চার ইঞ্চি লম্বা প্রতিটি ফলের ওজন ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম। শক্ত খোসার ভেতরের নরম শাঁস খেতে অনেকটা তালশাঁসের মতো।
গোলগাছের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। এর পাতা ঘরের ছাউনি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলের শাঁস খাওয়ার পাশাপাশি কাঁদি থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ও সিনিয়র মনিটরিং অফিসার (পার্টনার) মো. মোছাদ্দেক হোসেন জানান, গোলফলের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাত্র ৩৫ হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীরাও এটি নিরাপদে খেতে পারেন। তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলে প্রচুর লবণাক্ত পতিত জমি থাকায় গোলগাছ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
লোকজ চিকিৎসায় গোলফলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়দের মতে, কৃমি দমন, পানিশূন্যতা দূর, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও চর্মরোগ নিরাময়ে এটি সহায়ক। শিকড় সেদ্ধ করে খেলে আমাশয় ও অনিদ্রার উপশম হয়।
গোলগাছের কাঁদি থেকে রস সংগ্রহের কাজ শুরু হয় অগ্রহায়ণ মাসে। রসের ঘনত্ব খেজুরের রসের তুলনায় বেশি। যেখানে খেজুরের ষোলো কলসি রস থেকে এক কলসি গুড় হয়, সেখানে গোলের মাত্র আট কলসি রসেই সমপরিমাণ গুড় পাওয়া যায়। এই রস থেকে গুড়, পিঠা ও পায়েস তৈরি করা হয়। খুলনার গ্রামাঞ্চলে গোলের গুড়ের চাহিদা ব্যাপক। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় জনপদে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন গোলের গুড় উৎপাদিত হয়, যা শত শত পরিবারের জীবিকার উৎস।
ঐতিহাসিকভাবে গোলের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির সংস্কৃতি এসেছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। ১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে আগত রাখাইনরা এই ঐতিহ্য উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলার মিঠাখালী এলাকায় বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) গোলপাতার রস থেকে গুড় উৎপাদন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে।
যদিও গোলফলের বাণিজ্যিক বাজার এখনও সীমিত, তবু বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের পাশে পর্যটকদের কাছে গোলফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন আবদুর রহমান শেখের মতো অনেকেই।
গোলপাতা শুধু একটি উদ্ভিদ নয়—এটি উপকূলীয় মানুষের জীবন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে গোলফল একদিন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!