হোম / আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের ‘গোপন ক্ষমতা’: লাখো মুসলমানের পরিচয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে—নতুন প্রতিবেদনে উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ১৮১৮ বার
যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের ‘গোপন ক্ষমতা’: লাখো মুসলমানের পরিচয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে—নতুন প্রতিবেদনে উদ্বেগ

নিউজ ডেস্কঃ

যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব বাতিলের একটি ‘চরম ও গোপনীয়’ আইনি ক্ষমতা দেশটির লাখো মুসলমানকে ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে—এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে। মানবাধিকার সংস্থা রানিমিড ট্রাস্ট ও রিপ্রিভের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান আইনের আওতায় যুক্তরাজ্যে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ—যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ—স্বরাষ্ট্রসচিবের একক সিদ্ধান্তে নাগরিকত্ব হারাতে পারেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই আইনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার পারিবারিক শিকড় রয়েছে—এমন জনগোষ্ঠীর ওপর। গবেষণাকারীদের মতে, বিষয়টি কেবল বৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি গভীর কাঠামোগত হুমকি তৈরি করেছে। এর ফলে মুসলমানদের ব্রিটিশ পরিচয় কার্যত ‘শর্তসাপেক্ষ’ হয়ে পড়েছে—যা সাদা ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

বর্তমান আইনে বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হন—সে দেশে তিনি কখনো না থেকেও থাকলে—তবু যুক্তরাজ্য সরকার তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে। এই ব্যবস্থার কারণে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে পারিবারিক সংযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।

রিপ্রিভের গবেষক মায়া ফোয়া বলেন, “আগের সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে নিরীহ মানুষদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে। বর্তমান সরকার সেই ক্ষমতা আরও সম্প্রসারিত করেছে।”
রানিমিড ট্রাস্টের প্রধান শবনাহ বেগম বলেন, “উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারিতে যেমন ক্যারিবিয়ান বংশোদ্ভূতরা অন্যায়ের শিকার হয়েছিল, এখানেও তেমনই অন্যায় হচ্ছে। নাগরিকত্ব কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি একটি মৌলিক অধিকার। অথচ সরকার সেটিকে এখন ভালো-মন্দ আচরণের মানদণ্ডে মাপছে।”

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজন সাদা ব্রিটিশের মধ্যে মাত্র একজন এই আইনের ঝুঁকিতে থাকলেও, প্রতি পাঁচজন রঙিন মানুষের মধ্যে তিনজনই নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই মুসলমান, যাদের শিকড় দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকায়।

২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ‘জনস্বার্থে’ এই আইনের আওতায় ২০০ জনের বেশি মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। ২০২২ সালে সরকার এমন ক্ষমতাও যুক্ত করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে না জানিয়ে সরাসরি তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া যায়। প্রতিবেদনে এমন ঘটনাও উঠে এসেছে, যেখানে সরকার ভুলভাবে ধরে নিয়েছে কেউ অন্য দেশের নাগরিক হতে পারেন—পরবর্তীতে আদালত জানায়, ওই ব্যক্তিরা বাস্তবে রাষ্ট্রহীন হয়ে গেছেন।

এমনকি আদালত নাগরিকত্ব বাতিলকে অবৈধ ঘোষণা করলেও, আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাগরিকত্ব ফিরে পান না। এই আইনের সবচেয়ে আলোচিত শিকার ব্রিটিশ নাগরিক শামীমা বেগম। তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ধরে নিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হলেও, বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করে জানায়—তিনি কখনোই বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না। সাবেক বিচারপতি ডিকলান মরগানও শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিলকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন।

একই বিষয়ে স্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে নাগরিকত্ব বাতিলের শর্ত ধীরে ধীরে শিথিল করা হয়েছে এবং এই ক্ষমতা প্রয়োগে বর্ণ, পরিচয় ও জাতিগত পটভূমির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কমিশনের মতে, এই আইন কার্যত একটি ‘দ্বিস্তর সমাজ’ তৈরি করছে—যেখানে কারও ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নির্ভর করছে তিনি মুসলমান কি না এবং তার পারিবারিক শিকড় কোথায়।

এই প্রেক্ষাপটে রিপ্রিভ ও রানিমিড ট্রাস্ট অবিলম্বে নাগরিকত্ব বাতিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ব্রিটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ধারা ৪০(২) বাতিল এবং যাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের তা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা—এই আইন বহাল থাকলে যুক্তরাজ্যে লাখো মুসলমান স্থায়ী অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হবেন।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!