হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

মহাকালের মহাযাত্রা ও মানবতার প্রশ্ন প্রযুক্তি কি আমাদের নৈতিক পথচ্যুত করছে?

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৪২ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ৬৯ বার
মহাকালের মহাযাত্রা ও মানবতার প্রশ্ন প্রযুক্তি কি আমাদের নৈতিক পথচ্যুত করছে?
মহাকালের মহাযাত্রা ও মানবতার প্রশ্ন প্রযুক্তি কি আমাদের নৈতিক পথচ্যুত করছে?

মনজুরুল ইসলাম

বিশ্বের সব ধর্ম ও দর্শনের একটি অভিন্ন বাণী আছে—মানুষের প্রকৃত শক্তি তার প্রযুক্তিতে নয়, তার নৈতিকতায়। অথচ আজকের সভ্যতা সেই নৈতিক ভিত্তিকে ক্রমেই উপেক্ষা করে প্রযুক্তিকে সর্বশক্তিমান করে তুলছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মহাকালের এই মহাযাত্রা কি মানবতার উন্নতির পথে, না আত্মবিনাশের দিকে?

সব ধর্মেই জ্ঞানকে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে জ্ঞানকে মুক্তির পথ বলা হয়েছে, বৌদ্ধধর্মে প্রজ্ঞাকে দুঃখমুক্তির চাবিকাঠি ধরা হয়েছে, ইসলাম জ্ঞানকে আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে, খ্রিস্টধর্ম জ্ঞানকে ভালোবাসা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু যখন এই জ্ঞান অহংকারে রূপ নেয়, তখনই নৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়।

আজ প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে তা মানুষের সহমর্মিতা, ধৈর্য ও মানবিক সম্পর্ককে ক্ষয় করছে। যন্ত্রের গতি বেড়েছে, মানুষের মনুষ্যত্ব কমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে কাছাকাছি এনেছে, আবার বিভক্তও করেছে। অস্ত্র প্রযুক্তি নিরাপত্তা দেয়নি, দিয়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তা।

সর্বধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা বলে—অহিংসা, সংযম ও ন্যায়ই সভ্যতার মূল স্তম্ভ। অথচ আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতা ও ভোগের প্রতিযোগিতা সেই স্তম্ভগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রকৃতির ওপর সীমাহীন দখলদারিত্ব সব ধর্মের শিক্ষার পরিপন্থী। মানুষ পৃথিবীর রক্ষক, মালিক নয়—এই বোধ হারিয়ে যাওয়াতেই পরিবেশ সংকট আজ বৈশ্বিক হুমকিতে রূপ নিয়েছে।

তাহলে পরিত্রাণের পথ কী?
সর্বধর্মীয় নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর একটাই—নৈতিকতার নেতৃত্বে প্রযুক্তি। প্রযুক্তিকে পরিত্যাগ নয়, বরং তাকে মানবকল্যাণের সেবায় নিয়োজিত করতে হবে। উন্নয়ন হতে হবে সংযত, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই। রাষ্ট্রকে নৈতিক আইন প্রণয়ন করতে হবে, সমাজকে দায়িত্বশীল হতে হবে, আর ব্যক্তিকে বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় কেবল দক্ষতা নয়, মূল্যবোধ শেখাতে হবে। পরিবারে শেখাতে হবে সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ। ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার নয়, মানবিক ঐক্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ সব ধর্মই শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার পথ দেখায়।

মহাকালের মহাযাত্রার শেষ কোথায়—তা নির্ধারিত হবে মানুষের আজকের বেছে নেওয়া পথে। যদি নৈতিকতা পথনির্দেশক হয়, তবে প্রযুক্তি হবে আশীর্বাদ। আর যদি নৈতিকতা উপেক্ষিত হয়, তবে সেই প্রযুক্তিই হয়ে উঠবে সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আজ সময়ের দাবি একটাই—মানুষ আগে, প্রযুক্তি পরে। মানবতা আগে, ক্ষমতা নয়।

লেখক: সাংবাদিক,মহাকাল গবেষক,মানবাধিকার কর্মী

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!