হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

বিগত ৪০ বছর ধরে যে বাজারে বিক্রি হয়নি গরুর মাংস, প্রথা ভাঙতেই উত্তেজনা!

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ২২০ বার

হুমায়ুন কবির সূর্য, কু‌ড়িগ্রাম:১২-০৪-২৬

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকিনীর-পাঠ বাজার, একটি ব্যতিক্রমী বাজার, যেখানে প্রায় চার দশক ধরে গরুর মাংস বিক্রি হয়নি। হিন্দু অধ্যুষিত এ এলাকায় দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চলে আসছিল এই প্রথা। তবে সম্প্রতি ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সেই প্রথা ভেঙে গরু জবাইয়ের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে ব্যক্তি মালিকানায় বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। এর আগে এখানে কোন বাজার ছিলো না। শুরুতে এটি ছোট পরিসরের হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এখানে দোকানপাট গড়ে ওঠে। তবে বাজারে গরুর মাংস বিক্রি না করার শর্তে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সম্মতিতেই বাজারটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। বাজারে একটি হিন্দুদের কালী মন্দির রয়েছে। শুরুর দিকে হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন দোকান-পাট দিয়ে বাজার গড়ে তোলার অনুরোধ করলে হিন্দুরা এতে সহযোগিতা করে। তবে অনুরোধ ছিলো মন্দিরের সামনে গরু জবাই যাতে না করা হয়। এরপর বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আ.লীগসহ সব ধরনের সরকারেরর শাসনামলে এই রীতি মেনেই বাজারটি পরিচালিত হতো।

সম্প্রতি, ৪০ বছর ধরে চলা এই প্রথা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাজারে একটি গরু জবাই করা হয়, যা দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়মের ব্যত্যয় হিসেবে দেখা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই সম্প্রদায়ের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা গত সপ্তাহের ৭ এপ্রিল থানায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে পুণরায় সিদ্ধান্ত হয়, বাজারে আগের মতোই গরু জবাই করা হবে না এবং পূর্বের প্রথা বজায় রাখা হবে। বৈঠকের দুইদিন পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

বর্তমানে এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় ব্যাবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন,’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখানে এতো বছরেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে কখনোই কোন বিষয়ে বিবাদ হয়নি। ঈদের সময় আজিজুল ইসলাম নামের এক ব্যাক্তি বাজারে গরু জবাই করার কারণে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আমরা মুসলিম- হিন্দু মিলেমিশে এই বাজারে বসবাস করি। আমরা কোন অশান্তি চাই না।

স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, শুধু আ.লীগ আমলে নয়, এরশাদ-বিএনপির আমলেও এই বাজারে গরু জবাই হয়নি কখনো। আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে এ রীতি চলে আসছে। আমরা সবাই এটা মানি। ৫ মিনিটের রাস্তা হাঁটলেই চারদিকে ৩-৪ টা বাজারে আমরা গরুর মাংস কিনে আনতে পারি।

বাজারে অবস্থিত কালী মন্দির কমিটির সদস্য কাঞ্চন কুমার বর্মন বলেন,’ এখানে শুরুতে কোন বাজার ছিল না। ৪০ বছর আগে মুসলিম ভাইদের অনুরোধে এখানে বাজার গড়ে ওঠে। মন্দির বাজারের মাঝখানে অবস্থান করার কারণে অনুরোধ করা হয়েছিল গরু জবাই না করার জন্য। সেই অনুরোধে ৪০ বছর ধরে এখানে গরু জবাই ও মাংস বিক্রি হয় না।

মন্দির কমিটির আরেক সদস্য নিতাই রায় বলেন,’ আমরা অনুরোধ করেছি সেই অনুরোধে এখানে গরু জবাই হয় না। এখন যদি তারা গরু জবাই করতে চান তাহলে আমাদের কোন বাঁধা নেই। তবে আমাদের ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত না দেয়ার আবারও অনুরোধ জানাই।

গরু জবাই করা ও ৪০ বছরের প্রথা ভাঙা আজিজুল হক বলেন, সময়ের প্রয়োজনে এখানে মুসলিম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও বাজারে গরুর মাংসের চাহিদা রয়েছে। হিন্দুদের কোন আপত্তি বা বাঁধা নেই গরু জবাই করতে। আমাদের কিছু মুসলিম নামধারী মানুষ বাঁধা দিচ্ছে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য।

এদিকে, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, এলাকাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি হওয়ায় এবং বাজারে মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় দুই ধর্মের মানুষের সমঝোতায় এতদিন বাজারে গরু জবাই হয়নি। এখন একটি মহল সেই ঐতিহ্য ভেঙে সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

নাগেশ্বরী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান বলেন, বাজার মালিক নিজ উদ্যোগেই সম্প্রীতি বজায় রাখতে গরুর মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ধরণর প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপ ছিল না। #

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!