মনজুরুল ইসলাম
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে পিআরও (Public Relations Officer) হিসেবে সরাসরি সাংবাদিক নিয়োগের একটি প্রস্তাব ঘিরে গণমাধ্যম অঙ্গনে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ” হিসেবে পরিচিত—যার মূল দায়িত্ব হচ্ছে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। সেখানে সাংবাদিককে সরকারি দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও পেশাগত স্বাতন্ত্র্যের জন্য কতটা হুমকি—এই প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং জনস্বার্থে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা। অন্যদিকে পিআরও’র দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ইতিবাচক ভাবমূর্তি রক্ষা, নীতি-সিদ্ধান্ত প্রচার এবং সমালোচনাকে কৌশলে সামাল দেওয়া।
অর্থাৎ সাংবাদিকতা যেখানে প্রশ্ন তোলে, পিআর সেখানে উত্তর সাজায়। সাংবাদিক যেখানে তথ্যের স্বাধীন অনুসন্ধান করে, পিআর সেখানে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ দুই ভূমিকাকে একত্রিত করা মানে পেশাগত স্বার্থের সরাসরি সংঘাত (Conflict of Interest) সৃষ্টি করা।
সংবিধান ও আইনের আলোকে বিষয়টি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি সাংবাদিকদের সরাসরি সরকারি পিআর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তা সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়া, সরকারি চাকরি সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী যেকোনো নিয়োগে নির্দিষ্ট যোগ্যতা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। যদি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বা প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রস্তাব আনা হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক ন্যায্যতা ও সমতার নীতির বিরোধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনগতভাবে বিষয়টি নিম্নোক্ত প্রশ্ন উত্থাপন করে—
১. এটি কি সরকারি চাকরির স্বচ্ছতা নীতির লঙ্ঘন?
২. এটি কি পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার মাধ্যমে সাংবিধানিক অধিকারকে পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করছে?
৩. এ প্রস্তাবের মাধ্যমে কি রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে?
যদি প্রস্তাবটি সাংবাদিকদের স্বাধীন ভূমিকা খর্ব করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে তা “অবস্থানগত স্বার্থের সংঘাত” সৃষ্টি করে এবং প্রশাসনিক আইনের দৃষ্টিতে তা চ্যালেঞ্জযোগ্য হতে পারে। প্রয়োজনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করে বিষয়টির বৈধতা যাচাই চাওয়া যেতে পারে।
নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ
বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সাংবাদিকতা ও সরকারি জনসংযোগ বিভাগকে স্পষ্টভাবে পৃথক রাখা হয়। কারণ গণতন্ত্রে মুক্ত সংবাদমাধ্যমই রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। যদি সাংবাদিকদের সরকারি কাঠামোর অংশ বানানো হয়, তাহলে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এটি গণমাধ্যমের আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। জনগণ যদি মনে করে সাংবাদিকরা সরকারের অংশ, তবে সংবাদপত্রের উপর আস্থা কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে
করণীয় হতে পারে
১. প্রস্তাবটি জনসম্মুখে প্রকাশ করে স্বচ্ছ আলোচনা নিশ্চিত করা।
২. সাংবাদিক সংগঠনগুলোর জরুরি বৈঠক ডেকে ঐকমত্য গঠন।
৩. প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিষয়টির সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই।
৪. সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো।
সর্বশেষে সকলের স্মরণ রাখা দরকার
সাংবাদিকতা কোনো সরকারি পদ নয়; এটি একটি স্বাধীন পেশা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। পিআরও হিসেবে সাংবাদিক নিয়োগের প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে চতুর্থ স্তম্ভকে প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনস্থ করার সূচনা। রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রস্তাবকারীদের উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া ও আইনগত ভিত্তি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
স্বাধীন সাংবাদিকতা টিকলে গণতন্ত্র টিকে—এই মৌলিক সত্য ভুলে গেলে চলবে না।
***
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, সমাজ সংস্কারক ও মহাকাল গবেষক।

Leave a Reply