খুলনা প্রতিনিধিঃ
খুলনা জেলার পাইকপাইকগাছার চাঁদখালীতে অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ কয়লার চুল্লিতে পুড়ছে সরকারি ওয়াবদা-খাস জমি, কবর-শ্মশান; নীরব দর্শক পরিবেশ অধিদপ্তরগাছা উপজেলার ৯নং চাঁদখালী ইউনিয়ন আজ পরিবেশ ধ্বংসের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। একদিকে অবৈধ ইটভাটা, অন্যদিকে অবৈধ কাঠ কয়লার চুল্লির আগুনে পুড়ছে সরকারি ওয়াবদা রাস্তা, খাস জমি, কবরস্থান ও শ্মশান। নির্বিচারে মাটি কাটা ও বৃক্ষ নিধনের ফলে এলাকাটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক নীরব পরিবেশ বিপর্যয়ের কেন্দ্রে। অথচ এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না—যেন তারা ‘কাঠের চশমা’ পরে সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে কিছু অসাধু মাটি ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ওয়াবদা রাস্তা ও শত শত বিঘা খাস জমির মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এর ফলে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ওয়াবদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নদীর পানি ঢুকে পড়ছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা ও ফসল হারানোর আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলায় প্রায় ১৩টি ইটভাটা রয়েছে, যার মধ্যে ১০টিই চাঁদখালী ইউনিয়নে অবস্থিত। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—একটিও ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের বৈধ ছাড়পত্র নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভাটাগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব ৫০০ হাতেরও কম, যেখানে আইন অনুযায়ী ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্ব বাধ্যতামূলক। ফলে সবগুলো ইটভাটাই আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
ইটভাটার পাশাপাশি এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ কাঠ কয়লার চুল্লি। এসব চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির গাছ, রাস্তার পাশের বৃক্ষ, বাগান ও বসতভিটার গাছ। প্রতিদিন হাজার হাজার গাছ কেটে কয়লা বানানোর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, বৃক্ষ নিধনের এই উৎসব যেন দেখার কেউ নেই।
কাঠ কয়লার চুল্লি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা, চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক বাসিন্দা জানান, দিনের পর দিন ঘন ধোঁয়ার কারণে ঘরে থাকাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। এটি এখন একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ কয়লার চুল্লি সরাসরি লঙ্ঘন করছে—ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯), বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, বন আইন, ১৯২৭ (সংশোধিত), সরকারি সম্পত্তি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন এবং খাস জমি ও ওয়াবদা সংক্রান্ত বিধান। আইন অনুযায়ী এসব অপরাধের জন্য ভাটা বন্ধ, চুল্লি উচ্ছেদ, মোটা অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ কয়লার চুল্লির পাশেই অবস্থিত একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—চাঁদখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদখালী বহুমুখী হাই স্কুল, চাঁদখালী কলেজ, জামিয়া ইসলামিয়া শামসুল উলুম মাদ্রাসা ও খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত ধোঁয়া ও পরিবেশ দূষণের মধ্যে পড়াশোনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? তবে কি প্রভাবশালীদের কাছে আইন আজ জিম্মি?
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। নীরবে সহ্য করছেন পরিবেশ ধ্বংস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। চাঁদখালীর সাধারণ মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—এই অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ কয়লার চুল্লির আগুন থেকে তারা কবে মুক্তি পাবে?
অপরাধ
পাইকগাছার চাঁদখালীতে অবৈধ ইটভাটা ও কাঠ কয়লার চুল্লিতে পুড়ছে সরকারি ওয়াবদা-খাস জমি, কবর-শ্মশান; নীরব দর্শক পরিবেশ অধিদপ্তর
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৫ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৬২ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply