ডেস্ক রিপোর্ট:
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালজুড়ে বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। আগ্রাসী করনীতি ও শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নিজের বিতর্কিত নীতির মাধ্যমে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন, তেমনি মার্কিন জনগণের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে মার্কিন অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। সামরিক হস্তক্ষেপ ও কূটনৈতিক চাপ কতটা যুক্তিসংগত—সে প্রশ্ন উঠেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই। অনেকের মতে, এসব সিদ্ধান্ত মার্কিন জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয়।
বর্তমানে ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরে ইরানকে প্রতিপক্ষ বানানোর কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বরং বাস্তবতায় ট্রাম্প প্রশাসন নিজস্ব স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। আফগানিস্তান ইস্যুতেও একই চিত্র দেখা গেছে। একসময় কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে আসতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। ২০২১ সালে তালেবান সরকারের উত্থান মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ধারণাগত দুর্বলতাই স্পষ্ট করেছে।
ভূ-রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। রাশিয়ার সমর্থনে ইরান আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে পেরেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে সরে আসার প্রবণতা জবাবদিহিতা এড়ানোর কৌশল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, প্রায় ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছে ওয়াশিংটন।
এদিকে, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে ট্রাম্পের দাবিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি সাতটি যুদ্ধ বন্ধ করার কৃতিত্ব দাবি করলেও সমালোচকদের প্রশ্ন—একটি দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপসারণ কি আদৌ শান্তির উদাহরণ হতে পারে? বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে নানা রাষ্ট্র ও বিশিষ্টজনদের কণ্ঠে ধিক্কার শোনা গেছে।
ভারত, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও কৌশলগত টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কেনার কারণে ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরোপের হুমকি আবারও ট্রাম্পকে আলোচনায় এনেছে। তবে চীনের সঙ্গে বিরোধ কমে আসায় ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিকল্প বাজার ও জোট গঠনে এই তিন দেশই শুল্কভীতি উপেক্ষা করে এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির পেছনে বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক সংকট আড়াল করা। ভেনেজুয়েলার তেলের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি নজর এবং ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীর সম্ভাব্য আগ্রহও সেই ইঙ্গিত দেয়। এসব সমীকরণ বদলালে ভবিষ্যতে শুল্কনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
এই পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে টিকে থাকতে হলে কূটনৈতিক নীতিতে সময়োপযোগী পরিবর্তন আনতে হবে। ভিসা জটিলতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও বেকারত্বের চাপে অর্থনীতি দুর্বল হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে বন্ধুদেশের পরিধি বাড়ানো জরুরি।
দেশ এখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিই বলে দেবে আমরা কোন পথে এগোচ্ছি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে আমাদের অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আন্তর্জাতিক
পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি ও আমাদের করণীয়
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ২৬ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply