হোম / আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি, ইউরোপ–ভারত চুক্তি ও মার্কিন শুল্ক হ্রাস: চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প

প্রকাশ: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৫ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ১০ বার


বিশেষ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে একাধিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ মিলিয়ন শ্রমিক সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গার্মেন্টস শিল্পের বিকল্প কার্যত নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতা, চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় এই খাত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ আলোচনার পর একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, যা কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ হবে।
এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় পোশাক পণ্যের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। একই সঙ্গে চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার ক্ষেত্রেও শুল্ক হ্রাস বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ভারত। ২০২৭ সালে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা এই চুক্তিকে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
ভারতীয় গণমাধ্যম জি নিউজ জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একটি বড় অংশ ভারতের দখলে চলে যেতে পারে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল দাবি করেছেন, ইউরোপে ভারতের টেক্সটাইল রপ্তানি বর্তমান ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে আসছে। এর ফলে বাংলাদেশ ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টের মতো পণ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি গেছে ইউরোপীয় বাজারে, যার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ভারতের তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, শুল্ক সুবিধা এবং কূটনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। নির্বাচনকালীন অনিশ্চয়তা, নতুন সরকারের জন্য পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতি ও বাণিজ্য নীতিকে আরও সক্রিয় ও কৌশলগত হতে হবে। অন্যথায়, তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!