হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

ধান থেকে চাল: দামের অস্বাভাবিক ফারাক—কৃষকের ক্ষতি, কার লাভ?

প্রকাশ: ৪ মে ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ১৪৯ বার

মনজুরুল ইসলাম

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি কঠিন বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে—ধানের দাম ও চালের দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান। মাঠে কৃষক যে ধান উৎপাদন করছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন; অথচ কিছুদিন পর সেই ধান থেকেই উৎপাদিত চাল ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে। এই বৈপরীত্য কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতা, অদক্ষতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের ইঙ্গিত বহন করে।

বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনের খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সার, বীজ, সেচের জন্য ডিজেল বা বিদ্যুৎ, শ্রমিক মজুরি—সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ ১,২০০ থেকে ১,৪০০ টাকার মধ্যে। শ্রমবাজারে দৈনিক মজুরি ১,০০০–১,৩০০ টাকায় পৌঁছানোয় ফসল তোলার খরচই বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর বিপরীতে মৌসুমের চাপে কৃষক যখন ধান বিক্রি করতে যান, তখন স্থানীয় হাটে দাম নেমে আসে ৭০০–৮৫০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতিটি মণে কৃষক সরাসরি লোকসান গুনছেন।

এদিকে বাজারে চালের দাম স্থির থাকে না। ধান সংগ্রহের পর কয়েক ধাপ পেরিয়ে—সংগ্রাহক, ফড়িয়া, আড়তদার, মিলার ও পাইকার—চাল পৌঁছায় খুচরা বাজারে। এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতার অভাব এবং সীমিত সংখ্যক বড় মিলারের প্রভাব বাজারকে অস্থির করে তোলে। অভিযোগ আছে, কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও মিলার মিলে ধান কম দামে কিনে গুদামজাত করেন এবং সরবরাহ ধীরে ছেড়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সরাসরি ভোক্তার পকেটে।

সরকার প্রতিবছরই ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্য ঘোষণা করে। উদাহরণস্বরূপ, ধান সংগ্রহমূল্য অনেক সময় উৎপাদন খরচের কাছাকাছি বা তার কিছু বেশি নির্ধারণ করা হয়, যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ সীমিত। গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা, মান বা প্রক্রিয়াগত জটিলতার অজুহাতে অনেক কৃষক বাদ পড়ে যান। এতে করে ঘোষিত মূল্য কাগজে থাকলেও বাজারে তার প্রভাব কম পড়ে, এবং মধ্যস্বত্বভোগীরাই সুযোগটি বেশি নেয়।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। খাদ্য নিরাপত্তায় এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে কৃষকের প্রণোদনা ও লাভজনকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কিন্তু যখন কৃষক ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েন, তখন তারা বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকতে পারেন—যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং আমদানি নির্ভরতা বাড়াতে পারে।

সমাধানের পথ তাই বহুমুখী হতে হবে। প্রথমত, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও সহজলভ্য করতে হবে। ডিজিটাল নিবন্ধন, মোবাইল অ্যাপ বা স্থানীয় সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকদের তালিকাভুক্ত করে সরাসরি মাঠপর্যায়ে ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মিলার ও বড় ব্যবসায়ীদের স্টক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। নিয়মিত স্টক ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা এবং মজুতের সীমা নির্ধারণ করলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে।

তৃতীয়ত, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

চতুর্থত, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে উৎসাহ দিলে সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং একচেটিয়া প্রভাব কমবে।

ধান থেকে চাল—এই যাত্রাপথে যে মূল্যসংযোজন ঘটে, তা যুক্তিসঙ্গত হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সেই ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং তার বোঝা বহন করে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই, তখন সেটি আর শুধু বাজারের বিষয় থাকে না; সেটি নীতিনির্ধারণ ও সুশাসনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

কৃষককে টিকিয়ে রাখা মানে শুধু একটি পেশাকে টিকিয়ে রাখা নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই ধান-চালের এই দামের ব্যবধান কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—নইলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিয়ে দিতে হতে পারে।

লেখক:সাংবাদিক, মহাকাল গবেষক, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!