মনজুরুল ইসলাম
বিশ্ব আজ এক গভীর অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরতে পরতে যে উত্তেজনা জমে উঠছে, তা আর কেবল আশঙ্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—বরং তা স্পষ্টভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শন, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা মানবসভ্যতাকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলমান, মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই, আর তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মুখোমুখি অবস্থান বিশ্বকে নতুন করে আতঙ্কিত করছে। এসব সংঘাত আর আলাদা কোনো আঞ্চলিক ঘটনা নয়; বরং এগুলো বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অংশ, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত গোটা পৃথিবীকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আধুনিক যুদ্ধ আর শুধু সৈন্য আর অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি আঘাত হানে। ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে সংকট। উন্নয়নশীল দেশগুলো এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় ও উন্নয়নমুখী দেশের জন্য এই বৈশ্বিক অস্থিরতা বিশেষভাবে উদ্বেগের। যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রপ্তানি বাণিজ্য, প্রবাসী আয়, জ্বালানি আমদানি ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, বৈশ্বিক সংঘাতের মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয় যুদ্ধের বাইরে থাকা সাধারণ দেশগুলোকে।
এই সংকটময় সময়ে বিশ্বনেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। যুদ্ধের হুমকি ও শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয়, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষমতার রাজনীতি নয়—মানবতার স্বার্থই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের দায়িত্বও কম নয়। যুদ্ধোন্মাদ প্রচারণা, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। শান্তির পক্ষে জনমত গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে—যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না, বরং রেখে যায় ধ্বংস, মৃত্যু ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তি, সংলাপ ও মানবিকতার পথে ফিরে আসতে হবে। এই কঠিন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ আর নেই।
লেখক: প্রাবন্ধিক,মহাকাল গবেষক,সাংবাদিক

Leave a Reply