হোম / অপরাধ
অপরাধ

একই প্রকল্প দ্বিতীয়বার দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাত টিআর-কাবিটা-কাবিখা প্রকল্প

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ১৫ বার
একই প্রকল্প দ্বিতীয়বার দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাত
একই প্রকল্প দ্বিতীয়বার দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাত

 

এস, কে সাহেদ, লালমনিরহাট প্রতিনিধি।

লালমনিরহাটে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর, কাবিখা, কাবিটা) প্রকল্পগুলোতে অনিয়মে পরিণত হয়েছে। একই প্রকল্প দ্বিতীয়বার বরাদ্দ দেখিয়ে করা হয়েছে সরকারি অর্থ আত্মসাত। “সরকার কা মাল দরিয়ামে ঢাল” এই প্রবাদ যেন বাস্তবে রুপ নিয়েছে ওই প্রকল্পগুলোতে। প্রকল্পগুলো পরিনত  হয়েছে নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধি মোটা তাজাকরণ প্রকল্পে।

এমন পরিস্থিতি  জেলার অনেক জায়গায় দৃশ্যমান। টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নেই, বাস্তবায়নে জবাবদিহি নেই আর তদারকিতে দায়সারা। ফলে সাধারণ মানুষের বাড়ছে ভোগান্তি,  আর শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে গ্রামীণ উন্নয়ন।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, 

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পে  অনিয়ম করে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলো শতভাগ কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক প্রকল্পে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে, কোথাও একেবারেই হয়নি। কোথাও আবার একই প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুইবার। আবার কোথাও  সামান্য মাটি ছিটিয়ে উঁচু নিচু সমান করে পুরো বিল তোলা করা হয়েছে। এ যেন প্রকল্প নয়, জনগণের টাকায় লুটপাটের এক বৈধ আয়োজন।

জানা যায়, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সরকারের উন্নয়নের ভাবমূর্তি নির্ভর করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর। এই দপ্তরের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে নগদ টাকা ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিয়ে আসছে সরকার। এসব বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়। এ কাজের তদারকি করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)। কিন্তু তদারককারী ও বাস্তবায়নকারীদের অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে প্রকল্পগুলোর কাজ হচ্ছে শুধু কাগজে কলমে। পরস্পর যোগসাজশে প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে আসছে ওই পিআইও অফিস।

জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ১ম ও ২য় এবং তৃতীয় কিস্তিতে টিআর,,কাবিখা-কাবিটা  প্রকল্পের আওতায় যে সকল প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যার  বেশিরভাগ  প্রকল্পে কাজ হয়েছে নামমাত্র । গেলো গত ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে তৃতীয় কিস্তিতে কাবিটা কর্মসূচীর আওতায় উপজেলার ১ নং ভোটমারী ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের মোঃ খান্নু’র বাড়ী হইতে নুরইসলাম মাষ্টারের বাড়ী পযন্ত ১০০ মিটার রাস্তা এইচবিবিকরণ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয় ৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটি শুধু কাগজে কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দের সমুদয় টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোন কাজই করা হয়নি। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, ওই প্রকল্প স্থানে পুর্বের এইচবিবিকরণ কাজ করাই ছিলো। পুর্বের করা প্রকল্প দ্বিতীয়বার দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা আত্মসাত করা হয়েছে । ওই উপজেলার ২ নং মদাতী ইউনিয়নে টিআর কর্মসূচীর আওতায় পরিত্যাক্ত একটি প্রতিষ্ঠান, ৩নং ওয়ার্ডের  তালুক শাখাতী হযরত আলী রাহমাহতুল্লাহ হাফিজিয়া মাদরাসা সংস্কারে বরাদ্দ দেয়া হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সেখানে কাজ হয়েছে নামমাত্র। বিষয় হলো ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ওই একই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে তালুক শাখাতী হযরত আলী (রাঃ) কওমী মাদরাসা নাম দিয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ দেয়া হয় ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। যার কাজও হয়েছে নামমাত্র। ওই প্রকল্পের সভাপতির দেয়া তথ্যমতে প্রতিষ্ঠানটি এখন পাঠদান বন্ধ রয়েছে। একই ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডে হেতেনের বাড়ীর তিপুতি হইতে ব্রাক্ষণপাড়া কালীমন্দির পযন্ত ৪৩০ মিটার রাস্তা সংস্কারে বরাদ্দ দেয়া হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার কোন কাজই করা হয়নি কিন্ত পুরো বিল উত্তোলন হয়েছে। পাশ্ববর্তী গোড়ল ইউনিয়নের গোড়ল দাখিল মাদরাসা উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়া হয় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫শত টাকা। যার কাজ করা হয়েছে ১০টি টিন ও ৬টি চিকন সিড়ি দিয়ে একটি চালা তৈরি। প্রায় পুরো টাকা প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের পকেটে চলে গেছে। একই ইউনিয়নের গোড়ল ৮নং ওয়ার্ডের ভাল্লাটারী হতে সিএমএস স্কুল পযন্ত ৭৫০ মিটার রাস্তায় মাটি কাটা বরাদ্দ ৩ লক্ষ ৬৭ হাজার ৮শত টাকা। বরাদ্দের টাকা উত্তোলন হলেও কাজের কাজ করা হয়েছে নামমাত্র। পাশের চলবলা ইউনিয়ন পরিষদের গেট নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয় ৪ লক্ষ টাকা। প্রকল্পের সভাপতি মর্জিনা বেগম এবং ওই ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করেছেন কিন্তু প্রকল্পের কাজ করেছেন নামমাত্র । উপজেলার কাকিনা ৩নং ওয়ার্ডের কাজীর হাট ওয়াব্দা বাধ লোকমানের বাড়ী হতে বেলালের বাড়ী পযন্ত ৩৫০ মিটার রাস্তা সংস্কারে বরাদ্দ দেয়া হয় ৩  লক্ষ ৫০ হাজার ২শত ৫৮ টাকা। যার কাজ  নামমাত্র করে উত্তোলন হয়েছে বরাদ্দের পুরো টাকা। 

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দেয়া তথ্য মতে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রথম কিস্তিতে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে টিআর প্রকল্প-৫৩ টি, কাবিখা প্রকল্প-২৪টি এবং কাবিটা প্রকল্প-৪২টির কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজের শেষ সময় ছিল ৩১ ডিসেম্বর। তবে এ রিপোর্ট লেখা পযন্ত বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি কিন্তু বিল তোলা হয়েছে অনেক প্রকল্পের।

এক প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্যা মর্জিনা বেগম জানান, নিয়ম মেনেই প্রকল্পের কাজ করে বিল তোলা হয়েছে। 

উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন জানান, প্রতিটি প্রকল্প উপজেলা পিআইও সরেজমিন দেখে বিল উত্তোলনের ব্যবস্থা করেছেন। অনিয়ম হলে তিনি বিল প্রদানের ব্যবস্থা করলেন কেন? বলে  উল্টো প্রশ্ন করেন।

তবে এ বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)  মাজহানুর রহমান বলেন, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের সকল প্রকল্পের কাজ দেখে বিল প্রদান করা হয়েছে। ভোটমারী ৮ নং ওয়ার্ডের একটি এইচবিবিকরণ রাস্তার কাজ পুর্বের করা কাজ দেখিয়ে ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় এবং বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনও করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই প্রকল্পের কাজ করা হবে। অপরদিকে মদাতী ইউনিয়নের পরিত্যাক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন নাম দেখিয়ে পর পর দুইবার বরাদ্দ কিভাবে পায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা স্বীকার করে বলেন, নাম পরিবর্তন করে বরাদ্দ অবশ্যই পেতে পারে তবে কাজ করেছে আবার করবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমা আক্তার জাহান জানান, আমি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি, প্রকল্পের বিষয় আমি সঠিক বলতে পারবো না। তবে যেসকল প্রকল্পের কাজে অভিযোগ রয়েছে তা আমি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবো।

স্থানীয় জনগণ বলছেন, সরকারি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বাইরে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। আর উন্নয়ন টেকসই ও স্বচ্ছ না করলে দুর্নীতির কমবে না।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!