হোম / আইন ও পরামর্শ
আইন ও পরামর্শ

৪০ বছরের সম্প্রীতির প্রথা ভেঙে কুড়িগ্রামের ডাকনীর-পাঠ বাজারে গরু জবাই, এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ণ পড়া হয়েছে: ৭০ বার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনীর-পাঠ বাজার—একটি ব্যতিক্রমী বাজার হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল, যেখানে প্রায় চার দশক ধরে গরুর মাংস বিক্রি হয়নি। হিন্দু অধ্যুষিত এ এলাকায় দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চলে আসছিল এই অনন্য প্রথা। তবে সম্প্রতি ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সেই প্রথা ভেঙে গরু জবাইয়ের ঘটনায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা ও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

রোববার (১২ এপ্রিল) সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে ব্যক্তি উদ্যোগে বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে ছোট পরিসরের হলেও সময়ের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এখানে দোকানপাট গড়ে ওঠে। তবে বাজারে গরুর মাংস বিক্রি না করার শর্তে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সম্মতিতেই বাজার পরিচালিত হয়ে আসছিল।

বাজারের মধ্যেই একটি কালী মন্দির অবস্থিত। বাজার প্রতিষ্ঠার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছিল, মন্দিরের সামনে গরু জবাই না করার জন্য। সেই অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কোনো সরকার পরিবর্তন হলেও—বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা আওয়ামী লীগ—সব আমলেই এই রীতি বজায় ছিল।

তবে সম্প্রতি ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাজারে একটি গরু জবাই করা হয়, যা দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়মের ব্যত্যয় হিসেবে দেখা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যেও মিশ্র মতামত দেখা দেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৭ এপ্রিল দুই সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা থানায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে পুনরায় সিদ্ধান্ত হয়, পূর্বের মতো বাজারে গরু জবাই করা হবে না এবং দীর্ঘদিনের প্রথা বহাল রাখা হবে। তবে বৈঠকের পরও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা থামেনি।

বর্তমানে এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও স্থানীয়রা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন,

“স্বাধীনতার পর থেকে এখানে কখনো কোনো বিরোধ হয়নি। ঈদের সময় একজন গরু জবাই করায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকতে চাই, কোনো অশান্তি চাই না।”

স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন,

“আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকেই এখানে গরু জবাই হয়নি। আশেপাশে অন্য বাজারে গিয়ে সহজেই মাংস কেনা যায়, তাই এই নিয়ম মেনে চলায় কোনো সমস্যা হয়নি।”

বাজারের কালী মন্দির কমিটির সদস্য কাঞ্চন কুমার বর্মন জানান,

“মুসলিম ভাইদের অনুরোধে এখানে বাজার গড়ে ওঠে। মন্দিরের কারণে গরু জবাই না করার অনুরোধ করা হয়েছিল, যা তারা এত বছর ধরে সম্মান করেছেন।”

মন্দির কমিটির আরেক সদস্য নিতাই রায় বলেন,

“আমরা সবসময় সম্প্রীতি চাই। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার অনুরোধ জানাই।”

অন্যদিকে গরু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত আজিজুল হক বলেন,

“বর্তমানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে, গরুর মাংসের চাহিদাও রয়েছে। হিন্দুদের কোনো আপত্তি নেই, বরং কিছু মানুষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টি উসকে দিচ্ছে।”

এদিকে, সম্ভাব্য কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন নজরদারি জোরদার করেছে।

ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন,

“এলাকার ধর্মীয় ভারসাম্য ও সম্প্রীতি রক্ষায় এতদিন গড়ে ওঠা ঐতিহ্য ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান জানান,

“বাজারে গরুর মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্যোগ। এতে প্রশাসনের কোনো চাপ ছিল না।”

দীর্ঘদিনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ডাকনীর-পাঠ বাজারের ঐতিহ্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—যে সম্প্রীতির বন্ধন এত বছর ধরে অটুট ছিল, তা যেন ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন থাকে।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!