সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মতো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন যে সাংবাদিক কার্ড বিতরণ নীতিমালা জারি করেছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল—নিরপেক্ষ, পেশাদার ও স্বীকৃত সাংবাদিকদের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কাভারেজ নিশ্চিত করা। কিন্তু সাতক্ষীরার বাস্তব চিত্র সেই উদ্দেশ্যকে কার্যত উপহাসে পরিণত করেছে।
প্রকাশ্য অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় সাংবাদিক কার্ড বিতরণে নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে টাঙানো কার্ডপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়—পেশাদার সাংবাদিকতার সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই, এমন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি ও নিবন্ধনহীন ফেসবুকভিত্তিক তথাকথিত গণমাধ্যম নির্বিঘ্নে বৈধ সাংবাদিক কার্ড পেয়েছে।
প্রমাণ কী বলছে
তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নাম সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু মুহিত গাজী। তিনি কোনো নিবন্ধিত বা স্বীকৃত গণমাধ্যমের সাংবাদিক নন। অথচ একটি অনিবন্ধিত ফেসবুকভিত্তিক তথাকথিত ‘এ ওয়ান টিভি’-এর পরিচয়ে তাঁকে সাংবাদিক কার্ড দেওয়া হয়েছে।
এটি শুধু নির্বাচন কমিশনের নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন নয়, বরং নির্বাচনকালীন সংবাদ সংগ্রহের নিরাপত্তা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত।
এখানেই অনিয়মের শেষ নয়।
তালিকায় আরও দেখা যায়—
• কোনো প্রকার নিবন্ধনহীন ফেসবুক পেজ ‘আপন বাংলা’,
• তথাকথিত ‘গাঙচিল টিভি’,
• এবং ‘এনএএন টিভি’—এর নামেও বৈধ সাংবাদিক কার্ড ইস্যু করা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, এসব প্ল্যাটফর্মের কোনোটি তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল কিংবা নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃত তালিকায় নেই। প্রশ্ন উঠছে—কোন আইনি ভিত্তিতে, কোন চেকলিস্ট অনুযায়ী এসব নাম তালিকাভুক্ত হলো?
সংখ্যার হিসাবেও প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কাভারের জন্য প্রায় ১,২০০ জন আবেদন করেন। এর মধ্যে ৭৯১ জনকে সাংবাদিক কার্ড দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত গণমাধ্যমে কর্মরত প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিক। তাঁদের অনেকেই কার্ড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিপরীতে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা একটি ফেসবুক পেজ থাকলেই মিলেছে সাংবাদিক কার্ড।
সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ
সাতক্ষীরায় কর্মরত দৈনিক জনবাণী পত্রিকার সংবাদকর্মী এমডি রায়হান সিদ্দিকী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে সাংবাদিক কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিক নন—এমন রাজনৈতিক কর্মী ও অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ কার্ড পাচ্ছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকরা অপমানিত হচ্ছেন এবং পুরো নির্বাচন কাভারেজের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংসের মুখে পড়ছে।”
প্রশাসনের বক্তব্য বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মিস আফরোজা আখতার দাবি করেছেন, তাঁদের কাছে একটি নির্ধারিত চেকলিস্ট রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কার্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন—
“অনুমোদিত জাতীয়, স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের তালিকা অনুযায়ী যাঁরা ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেছেন, শুধু তাঁদেরই কার্ড দেওয়া হয়েছে।”
কিন্তু তালিকাভুক্ত বিতর্কিত ব্যক্তি ও তথাকথিত মিডিয়ার উপস্থিতি তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। ফলে প্রশাসনিক ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
একটি বিপজ্জনক নজির
নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে এভাবে সাংবাদিক কার্ড বিতরণ শুধু দায়িত্বহীনতা নয়; এটি একটি ভয়ংকর নজির—যেখানে সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব ও ফেসবুক পেজের দৌরাত্ম্যে।
এর পরিণতি শুধু সাংবাদিকতার মানহানি নয়; সুষ্ঠু নির্বাচন, নিরপেক্ষ তথ্যপ্রবাহ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও এটি মারাত্মক হুমকি।
আমাদের দাবি
এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানানো হচ্ছে—
• সাতক্ষীরায় সাংবাদিক কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়া অবিলম্বে পুনরায় যাচাই করতে হবে,
• নীতিমালাবহির্ভূত ও বিতর্কিত কার্ড তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করতে হবে,
• এবং এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নচেৎ ভবিষ্যতে সাংবাদিকতা হয়ে উঠবে রাজনৈতিক ছদ্মবেশ আর ফেসবুক পেজের লাইসেন্স—যার পরিণতি কোনোভাবেই গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ হতে পারে না।
অপরাধ
সাংবাদিকতার মুখোশে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশসাতক্ষীরায় নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা উপেক্ষা করে সাংবাদিক কার্ড বিতরণ—একটি ভয়ংকর নজির
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৭২ বার
সাংবাদিকতার মুখোশে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ
সাতক্ষীরায় নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা উপেক্ষা করে সাংবাদিক কার্ড বিতরণ—একটি ভয়ংকর নজির
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply