পটুয়াখালী প্রতিনিধিঃ
বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক সভ্যতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কল্পনাই করা যায় না। শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সবখানেই বিদ্যুৎ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত রামপাল পাওয়ার প্লান্ট ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
রামপাল পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের শুরুতে নানা বিতর্ক ও হতাশার কথা শোনা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র তার সক্ষমতা ও কার্যকারিতার প্রমাণ দিয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত ও উপেক্ষিত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক গতি এবং উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট দেশের বিদ্যুৎখাতে দ্বিতীয়বারের মতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রটি ৬৪০ মিলিয়ন ইউনিট (এমইউ) বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে। এর আগের মাস, অর্থাৎ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই কেন্দ্রটি ৭০০ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ মাসিক উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে।
রামপাল পাওয়ার প্লান্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বর মাসে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও দেশের অন্যান্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এই কেন্দ্রই সর্বাধিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। মাসিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৃতিত্ব অর্জন করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রথম স্থান অধিকার করে রামপালের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট।
একই সময়ে দেশে মোট ৫ হাজার ৫৩১ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে একাই প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে এই কেন্দ্রটি, যা স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) মধ্যেও সর্বোচ্চ। টানা দ্বিতীয় মাসে এমন সাফল্য দেশের বিদ্যুৎখাতে একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও কেন্দ্রটি আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তবে বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, ধারাবাহিক কর্মদক্ষতা এবং শক্তিশালী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে কম খরচে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। এতে শিল্পখাত সচল থাকছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আওতায় নির্মিত এই মৈত্রী প্রকল্পে আধুনিক সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক। পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে রয়েছে ফ্লু-গ্যাস ডিসালফারাইজেশন (এফজিডি) ইউনিট, ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর (ইএসপি), ২৭৫ মিটার উচ্চতার চিমনি, ক্লোজড-সাইকেল কুলিং সিস্টেম এবং শূন্য তরল নিঃসরণ ব্যবস্থা।
কর্তৃপক্ষ জানায়, গত দুই মাসে প্রায় ৮ লাখ টন কয়লা খালাস করা হয়েছে এবং বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে প্রায় দুই লাখ টন কয়লা মজুত রয়েছে। এই মজুত আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
শীত মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় উৎপাদন কিছুটা কম হলেও জাতীয় গ্রিডে সর্বাধিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে রামপাল পাওয়ার প্লান্ট তার অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পখাতের অগ্রগতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য, আর সে ক্ষেত্রে রামপাল পাওয়ার প্লান্ট একটি বড় ধরনের অবদান রেখে চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়েই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। বিদ্যুৎ উৎপাদনে রামপাল পাওয়ার প্লান্টের এই রেকর্ড সাফল্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় প্রাপ্তি এবং উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কুড়িগ্রাম
রামপাল পাওয়ার প্লান্ট ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাত: উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এক অনন্য মাইলফলক
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৪ অপরাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ১৪ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply