হোম / আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

ভারতে গরুর বাজারের সংকট: সীমান্ত রাজনীতি না জনজীবনের আর্তনা

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ২৬ বার

মনজুরুল ইসলাম

পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচা ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিছক একটি ব্যবসায়িক সংকট নয়; বরং এটি সীমান্ত অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবিকা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিল বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক সময়ে পশু পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি বৃদ্ধির ফলে খামারি, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরেই গবাদিপশু বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই বাজারকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। গ্রামের ছোট খামারি থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিক, হাট ইজারাদার, পশুখাদ্য ব্যবসায়ী—একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্র এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব যখন সরাসরি বাজারে পড়ে, তখন তার অভিঘাত পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে।

অবৈধ পাচার রোধ অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কঠোরতার ভেতরে বৈধ ব্যবসা কতটা সুরক্ষা পাচ্ছে? যদি একজন বৈধ খামারিকেও অতিরিক্ত হয়রানি, জটিলতা কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়, তবে সেটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতিফলন।

এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সীমান্ত ইস্যু বরাবরই স্পর্শকাতর। গরু পাচার, সীমান্ত দুর্নীতি কিংবা প্রশাসনিক শৈথিল্য—এসব বিষয় প্রায়ই রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে উঠে আসে। পশ্চিম বাংলার বিজেপি  নেতা ও নবনির্বাচিত মুখ্য মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ  বিষয়ে অবস্থান নিতে যাচ্ছেন—এমন আলোচনা তাই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই ইস্যুকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না।

কারণ বাস্তবতা হলো, সীমান্ত এলাকার মানুষের কাছে এটি রাজনীতির বিষয় হওয়ার আগে পেটের প্রশ্ন। হাটে গরু না উঠলে খামারির ক্ষতি হয়, ব্যবসা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় কমে যায়, বাজারে স্থবিরতা এলে পুরো স্থানীয় অর্থনীতি সংকুচিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের সীমান্ত অর্থনীতি বহু ক্ষেত্রেই একে অপরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে পশ্চিমবঙ্গের পশুর বাজারে সংকট তৈরি হলে তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। একদিকে অবৈধ কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করতে হবে, অন্যদিকে বৈধ খামারি ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বচ্ছ, সহজ ও নিরাপদ বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধান।

কারণ সীমান্তের মানুষের জীবন কখনোই রাজনৈতিক পরীক্ষার মাঠ হতে পারে না। তাদের জীবিকা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

লেখকঃ সাংবাদিক, মহাকাল গবেষক, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!