নাটোর প্রতিনিধি:
সাংবাদিকতা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম সম্মানজনক পেশা হলেও নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় সম্প্রতি এ পেশাকে ঘিরে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তি, মেকার, সেলসম্যান, দোকানদারসহ নানা পেশার লোকজন নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে উপস্থাপন করে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি প্রভাবশালী চক্র নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে প্রেসকার্ড ও পরিচয়পত্র সরবরাহ করে এসব ব্যক্তিকে পুনর্বাসন করছে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিকভাবে ব্যবহার করছে। অশিক্ষিত ও সার্টিফিকেটবিহীন অনেকেই ভুয়া আইডি কার্ড কোমরে ঝুলিয়ে, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সামনে ‘PRESS’ লিখে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের কেউ কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে একটি চক্র প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মশালায় অংশ নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব কোনো গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না করে ফেসবুকে একাধিক স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করা হচ্ছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে নিজেদের বড় সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অথচ সংশ্লিষ্ট নেতারা অনেক সময়ই জানেন না, এসব ব্যক্তি গোপনে একটি রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে।
গণহারে এ ধরনের লেবাসধারী ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃত সাংবাদিকদের নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কথিত সাংবাদিকদের ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও প্রশাসনের দাপট দেখিয়ে সুবিধা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, মাদক ও নারীঘটিত ঘটনাকে পুঁজি করে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে এক শ্রেণির ব্যক্তি সাংবাদিকতার নামে মাঠে নেমেছে। সম্প্রতি ভুয়া পরিচয় দিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের একটি চক্র সক্রিয় বলে দাবি সচেতন মহলের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও রাজশাহী অঞ্চলের সহকারী পরিচালক, সাবেক নলডাঙ্গা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বলেন,
“সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। কিন্তু যত্রতত্র প্রেসকার্ড বিতরণ ও নামসর্বস্ব গণমাধ্যমের কারণে এ পেশাকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। মূলধারার সাংবাদিক ও প্রশাসনের ঐক্যমত এখন অত্যন্ত জরুরি।”
দৈনিক সকালের সময় পত্রিকার নাটোর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম ডাবলু বলেন,
“সাংবাদিকতা কার্ডে নয়, কাজের মাধ্যমে পরিচয় তৈরি হয়। কিন্তু নলডাঙ্গায় এখন সাংবাদিক হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।”
বৈশাখী টিভির নাটোর প্রতিনিধি মো. ইসাহক আলী বলেন,
“অননুমোদিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও আইপি টিভি অনভিজ্ঞ ও ধান্দাবাজ প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে। এতে গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। এখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
এখন টিভির নাটোর রিপোর্টার মাহবুব হোসেন বলেন,
“নামসর্বস্ব অনলাইন পত্রিকার কারণে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।”
নাটোর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তর-এর নাটোর প্রতিনিধি শহীদুল হক সরকার বলেন,
“সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও কোড অব এথিকস মানা অত্যন্ত জরুরি। নিরপেক্ষতা বজায় না থাকলে এই পেশার সম্মান ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।”
এ বিষয়ে নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন বলেন,
“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভুয়া ও কার্ডধারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা আরও ক্ষুণ্ন হবে।
অপরাধ
নলডাঙ্গায় ভুয়া সাংবাদিকের দৌরাত্ম্য, উদ্বিগ্ন প্রশাসন ও প্রকৃত সংবাদকর্মীরা
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ণ
পড়া হয়েছে: ৭৪ বার
বিজ্ঞাপন

Leave a Reply