হোম / অপরাধ
অপরাধ

খালখনন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় বিএনপি নেতার নম্বর, ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে অর্থ আত্মসাত 

প্রকাশ: 7 July 2026, 05:10 PM পড়া হয়েছে: ১২ বার
খালখনন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় বিএনপি নেতার নম্বর, ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে অর্থ আত্মসাত
খালখনন প্রকল্পে শ্রমিক তালিকায় বিএনপি নেতার নম্বর, ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে অর্থ আত্মসাত

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় সরকারি খালখনন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ জনপদের অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত ওই প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে শ্রমিকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। খনন কাজের অনেক শ্রমিকদের নামের স্থানে রয়েছে বিএনপি নেতা, ব্যবসায়ী ও স্কুল শিক্ষকের মোবাইল নম্বর।

উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের ঝড়িরপাড় থেকে উপজেলার ভেলাবাড়ী  ইউনিয়নের ঢুসেরডেরা পুল পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্পে মোট ৩৮লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির শ্রমিক তালিকায় রয়েছে ইউনিয়ন ভিত্তিক ৪৫জন করে মোট ৯০জন শ্রমিকের নাম।

প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় শ্রমিক দিয়ে খননকাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে খাল খননে ভ্যাকু মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারি নথিপত্রে নাম থাকা অর্ধেক শ্রমিকও কাজ করেননি কিন্তু তাদের নামে বিল উত্তলন করা হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক কাজ করেছেন, আবার তালিকায় শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে বিএনপি নেতা, ব্যবসায়ী ও স্কুল শিক্ষকের। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু খালের এক পাশের পাড় উঁচু করা হয়েছে, আর ভ্যাকু মেশিন দিয়ে খননকাজ চলায় খালের তলদেশ যথাযথভাবে খনন করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিন ওই খালখনন প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন অংশে ১৭জন শ্রমিক কাজ করছেন। কিন্তু এই ইউনিয়নের তালিকায় রয়েছে ৪৫জন জন শ্রমিকের নাম। এসময় শ্রমিকরা জানান, তালিকায় নাম থাকা অনুপস্থিত শ্রমিকরা কাজ না করেও তাদের নামে বিল তোলা হয়েছে। এদিকে শ্রমিক তালিকায়  দেখা গেছে, উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের ৪৫জন ও ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ৪৫জন শ্রমিকের নাম রয়েছে। কিন্ত কাজে উপস্থিত ছিলেন দুই ইউনিয়নের মোট ৯০জন শ্রমিকের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০জন। বাকী ৫০জন শ্রমিকই অনুপস্থিত। তবুও তাদের নামে চেকের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। আর অনুপস্থিত শ্রমিকরা বিএনপি অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী ও স্কুল শিক্ষক।

তালিকায় দেখা যায়, শ্রমিক শ্রী অনন্ত কুমার রায় পিতা – খোকা রাম বর্মন এর নম্বরের স্থানে উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন  বিএনপির সভাপতি গোলাাম কিবরিয়া  রিপনের মোবাইল নম্বর ( 01740588705) ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রমিক ইসাহাক আলী, পিতা গফুর এর মোবাইল নম্বরের স্থানে পুরাতন ভেলাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী সোবহান আলীর মোবাইল নম্বর ( 01718292728) ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও তালিকায় রয়েছে স্কুল শিক্ষক, দোকান্দার ও অন্যান্য বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম।

ভুক্তভোগী একাধিক শ্রমিক জানিয়েছেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা কৌশলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পর চেক বইয়ে আগাম স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছেন। অথচ প্রকল্পের কাজে তাদের রাখা হয়নি। কৃষিশ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্পের নামে নামমাত্র কয়েকদিন কাজ করিয়ে তাদের সামান্য কিছু টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক চেকের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলনের সুযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

শ্রমিক রঞ্জিত কুমার, বেলাল হোসনে ও মোহর আলীসহ আরো অনেক শ্রমিক জানান, ১৭দিন কাজ করার পর বিএনপি নেতা রিপনের নির্দেশে তাদের ব্যাংকে ডেকে নিয়ে একই সঙ্গে ৩টি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে ৪হাজার ৫শত করে টাকা দেওয়া হয়।  ৫শত করে দিন হাজিরা হিসেবে বাকী টাকা চাইলে তারা টাকা পরে দেবে বলে জানিয়ে দেন। এছাড়াও অনেকের ফাঁকা চেকে সই নিয়ে রাখলেও তাদের কোন টাকা দেওয়া হয়নি।

খাল খনন কাজে তালিকায় শ্রমিকের নামের স্থানে ইউনিয়ন  বিএনপির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া রিপনের মোবাইল নম্বর থাকার বিষয়ে ওই বিএনপি নেতা জানান, ‘ তালিকায় কে বা কাহারা আমার মোবাইল নম্বর দিয়েছে, তা আমি জানি না’।

ওই খালখনন প্রকল্পের সম্পাদক নারী ইউপি সদস্যা সাইদা বেগম জানান, ‘আমি নাম মাত্র প্রকল্প সম্পাদক, সমস্ত কাজ দেখভাল করছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া রিপন।  স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে এসে ধমক দিয়েই অজস্র স্বাক্ষর নিয়ে যায়।

প্রকল্পের সভাপতি ইউপি সদস্য মোফাজ্জল হোসেন মোফা জানান, ‘জোর করে প্রকল্পের মাস্টার রোলে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। আমি প্রকল্প সভাপতি হলেও আমাকে খালখনন কাজ দেখাশোনার জন্য রাখেননি। তালিকার ভেলাবাড়ী অংশে ৪৫জন শ্রমিকের নাম থাকলেও কাজ করছেন ১৮ থেকে ২০জন শ্রমিক। আর তালিকায় বিএনপি নেতা, ব্যবসায়ী ও স্কুল শিক্ষকের নাম রয়েছে বলেও জানান তিনি’।

আদিতমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে। কাজ দেখেই বিল দেওয়া হচ্ছে। তবে শ্রনিকরা কাজের পুরা টাকা পেয়ে না থাকলে এ বিষয়ে অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!