উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
রাত তখন গভীর। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি ত্রিপল আর বাঁশের ঘরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই হঠাৎ আগুন—একটি ঘর থেকে আরেকটি ঘরে ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখা ভেঙে দেয় কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রাতের নীরবতা।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাত ১০টার দিকে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বি-ব্লকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে যায় অন্তত পাঁচটি ঘর। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্কে ছুটতে শুরু করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা—কারও কোলে শিশু, কারও হাতে সামান্য কিছু কাপড়, আবার কারও কিছুই না।
ধোঁয়া আর আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা যুবক আমানউল্লাহ কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
“কিভাবে আগুন লাগলো জানি না। হঠাৎ আগুন দেখি, তখন শুধু পরিবারকে নিয়ে বেরিয়ে আসার কথাই মনে ছিল। সব পুড়ে গেছে।”
আগুন লাগার পরপরই ক্যাম্পের ইমার্জেন্সি ফায়ার রেসপন্স ইউনিট, স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্যান্য রোহিঙ্গারা একসঙ্গে আগুন নেভাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাতে বালতি, মাটির ঢেলা আর পানির পাইপ—সবকিছু নিয়েই চলে প্রাণপণ চেষ্টা। দীর্ঘ প্রায় দেড় ঘণ্টার লড়াই শেষে রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে আগুনের সঠিক কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর আহমদ বলেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে আগুন নেভার পরও নিভে যায়নি আতঙ্ক। ছাইয়ের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের চোখে ভয়ের ছাপ, নারীদের মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রশ্ন। একটি ছোট ঘর—যেটুকু ছিল তাদের সবকিছু—তা হারিয়ে তারা আবারও দাঁড়িয়ে গেল শূন্য থেকে শুরু করার জায়গায়।
উল্লেখ্য, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প অগ্নিকাণ্ডের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর একই ক্যাম্পের ১ডব্লিউ ব্লকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সহস্রাধিক ঘর পুড়ে যায় এবং একজন নিহত হন। সেই স্মৃতি আজও রোহিঙ্গাদের তাড়া করে ফেরে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে উদ্বাস্তু জীবন। তার ওপর বারবার আগুন—কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গাদের কাছে আগুন যেন শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং অনিশ্চয়তার আরেক নাম। ছাইয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকেও তারা বাঁচার স্বপ্ন দেখে—আগামী রাতটা অন্তত যেন আগুন ছাড়া কাটে।

Leave a Reply