হোম / আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক

ইতিহাসের ধ্বনি আর ভক্তির জোয়ারে মুখর গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ণ পড়া হয়েছে: ১৯৫৯ বার
নাগেশ্বরীর ঐতিহাসিক গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির ধামে মহানামযজ্ঞ ও অষ্টকালীন লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত↗
নাগেশ্বরীর ঐতিহাসিক গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির ধামে মহানামযজ্ঞ ও অষ্টকালীন লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত↗

শফিকুল ইসলাম শফি,স্টাফ রিপোর্টার,মাসান টিভি

নাগেশ্বরীর ঐতিহাসিক গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির ধামে মহানামযজ্ঞ ও অষ্টকালীন লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত↗
নাগেশ্বরীর ঐতিহাসিক গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির ধামে মহানামযজ্ঞ ও অষ্টকালীন লীলা কীর্তন অনুষ্ঠিত↗

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের শ্রীপুর—নীরব গ্রামীণ জনপদের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আড়াইশ বছরের ইতিহাসবাহী গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির। সময়ের স্রোতে বহু উত্থান-পতন দেখেছে এই মন্দির, তবুও আজও এটি অটুট বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখলেই যেন ফিরে যাওয়া যায় দুই শতাব্দীরও বেশি আগের বাংলায়। ঢাকের তালে তালে কীর্তণের সুর, শঙ্খধ্বনি আর ‘হরি বল’ ধ্বনিতে চারদিক হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হলো মহানামযজ্ঞ ও অষ্টকালীন অপ্রাকৃত লীলা কীর্তণ। দুই বাংলার খ্যাতনামা কীর্তণীয়া ও ধর্মীয় সঙ্গীত শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ৩০ হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে।

গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দিরের ইতিহাস ফিরে তাকালে চোখে পড়ে বাংলার এক সংকটকালীন অধ্যায়। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরের পর (মতান্তরে ১৭৭২ সালে) রংপুরের মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরানীর নায়েব ভবানী পাঠক এই অঞ্চলের ভুমিহীন ও নিরন্ন মানুষদের আশ্রয় ও আত্মরক্ষার জন্য একাধিক শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এসব মন্দির পরবর্তীতে ‘ভবানী পাঠকের মঠ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। গোসাইবাড়ি শিবমন্দির তারই এক জীবন্ত স্মারক।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় এই মন্দির ছিল নীরব সংগ্রামের কেন্দ্র। দিনের আলোয় পূজা-অর্চনা, আর গভীর রাতে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ—এই ছিল সন্ন্যাসীদের পথচলা। স্থানীয়ভাবে ‘গোসাই ঠাকুর’ নামে পরিচিত এক সন্ন্যাসী এখানে অবস্থান করতেন। তাঁর নামানুসারেই মন্দিরটির নামকরণ হয় গোসাইবাড়ি শিবমন্দির।

আজও ভক্তদের বিশ্বাসে অটুট এই মন্দির। বহু মানুষ মনে করেন, এখানে এসে প্রার্থনা করলে মানসিক শান্তি লাভ হয় এবং অজানা এক শক্তির স্পর্শ পাওয়া যায়। তাই তো প্রতিবছর মহানামযজ্ঞ ও ধর্মীয় উৎসবে মানুষের ঢল নামে এই প্রাঙ্গণে।

দেশ স্বাধীনতার পর দেবোত্তর স্টেটের জমি বেহাত হওয়ায় একসময় মন্দিরের কার্যক্রম প্রায় থমকে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস হারিয়ে যেতে দেয়নি এখানকার মানুষ। হিন্দু ধর্মীয় নেতা, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত নাগেশ্বরী উপজেলা মহানামযজ্ঞ উদযাপন পরিষদ নতুন করে প্রাণ ফেরায় এই প্রাচীন স্থাপনায়। সাধারণ সম্পাদক শ্রী হরচন্দ্র ফন্টুর নেতৃত্বে শুরু হয় নিয়মিত পূজা, নামসংকীর্তন ও মহানামযজ্ঞের আয়োজন।

গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির আজ কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেমিশে উৎসবে অংশ নেন, ভাগ করে নেন আনন্দ ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি।

আয়োজক ও স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির ধাম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ইতিহাসের গৌরব, সংস্কৃতির ঐশ্বর্য আর ভক্তির আলোয় আবারও জেগে উঠুক গোসাইবাড়ি শিবমন্দির—এই প্রত্যাশাই আজ সবার।

বিজ্ঞাপন

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!